ঢাকা: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কেনার শঙ্কা এড়াতে মোবাইলে লেনেদেনের সীমা অর্ধেকে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই সুপারিশ মানতে নারাজ বালাদেশ ব্যাংক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সুপারিশকে অমূলক ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জাতীয় নির্বাচনে ভোট কেনার শঙ্কা এড়াতে মোবাইলে লিমিট অর্ধেক করা হলে তা ফলপ্রসূ হবে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে এমএফএস (মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস) সেবার সম্ভাব্য অপব্যবহার সংক্রান্ত বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সুপারিশ হাস্যকর ও ভিত্তিহীন। এমএফএস বন্ধ করে দিলে কার্ডে ট্রান্সফারসহ অন্যান্য মাধ্যমে লেনদেন হতে পারে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস-এর অপব্যবহার প্রতিরোধ করা নির্বাচন কমিশনের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ভোটারদের বেআইনি প্রলোভনে ফেলা, প্রচার ব্যয়ের সীমা লঙ্ঘন এবং নির্বাচনে আর্থিক অপরাধ গোপন করার জন্য এমএফএস এর অপব্যবহার বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করেছে। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ, ১৯৭২ (সংশোধিত ২০২৫) অনুসারে এজেন্ট ছাড়া একাধিক ব্যক্তির মাধ্যমে নগদ অর্থ পরিবহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনবহির্ভূত হওয়ায় প্রার্থীরা ভোটারদের প্রভাবিত করতে বিকল্প মাধ্যম হিসেবে এমএফএস সেবাকে ব্যবহার করে অর্থের অস্বচ্ছ প্রবাহ ঘটাতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচনকালে এমএফএস সেবার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে না পারলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা, সমতা ও ন্যায্যতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আর এজেন্ট হিসাবগুলোর ক্ষেত্রে লেনদেনের কোনোরূপ সীমা না থাকায় প্রার্থীরা তাদের পরিচিত এজেন্ট ব্যবহার করে টার্গেটেড ভোটারদের চাহিদা অনুসারে অর্থ পাঠিয়ে নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করার সুযোগ রয়েছে। অর্থ বিতরণের কৌশল হিসেবে দলীয় কর্মীদের মাধ্যমে টার্গেটেড ভোটারদের এমএফএস হিসাব সংগ্রহ করে এজেন্ট কর্তৃক (ক্যাশ-ইন) বিতরণ করতে পারে এবং ব্যক্তিগত এমএফএস হিসাব হতে ফান্ড ট্রান্সফার (সেন্ড মানি) করে অবৈধ অর্থ বিতরণ করতে পারে।
প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, নির্বাচনি প্রচার শুরুর দিন (২২ জানুয়ারি) থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত এমএফএসের সব ধরনের হিসাবের লেনদেনের পরিমাণের ঊর্ধ্বসীমা অর্ধেকে নামিয়ে আনার পাশাপাশি যথাযথ মনিটরিং ব্যবস্থা করতে হবে। তা না করলে এমএফএস সেবার অপব্যবহারের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। নির্বাচনে কালো টাকা ও অঘোষিত অর্থ এমএফএস সেবার অবৈধ ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত বিতরণ করে নির্বাচনের লেভেল প্লেইং ফিল্ড নষ্ট করার আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং এমএফএস নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক যথাযথ উদ্যোগ না নিলে কালো টাকা ও অঘোষিত তহবিল ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন বাধাগ্রস্ত হবে।
গত ২৭ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপন জারি করে জানায়, মোবাইলে ব্যাংকিংয়ে (এমএফএস) লেনদেনের সীমা বৃদ্ধি করেছে। ফলে একজন গ্রাহক তার অ্যাকাউন্টে দিনে ৫০ হাজার টাকা ক্যাশ ইন বা জমা করতে পারবেন। আর মাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা ক্যাশ ইন করতে পারেন। এর আগে দিনে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা ও মাসে ২ লাখ টাকা লেনদেন করতে পারতেন একজন গ্রাহক। তবে ব্যাংক ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে আগের মতো দিনে ৫০ হাজার ও মাসে ৩ লাখ টাকা অপরিবর্তিত রয়েছে। একইসঙ্গে দিনে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা তোলা বা ক্যাশ আউট করা যাবে। এ ছাড়া, প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা উত্তোলন করা যাবে। আগে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা তোলা বা ক্যাশ আউট করা যেত। আর মাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলনের সুবিধা ছিল।
এ ছাড়া, ব্যবসা থেকে ব্যক্তিকে অর্থ পাঠানোর (বিটুপি) দৈনিক সীমা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার করা হয়েছে। মাসিক ২ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে। আর হিসাবের স্থিতির সীমা ৩ থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। তবে ব্যাংক ট্রান্সফারের (ব্যাংক হিসাব ও কার্ড) আগে সীমা অপরিবর্তিত থাকবে। এ ক্ষেত্রে কোনো লেনদেনের সংখ্যা প্রযোজ্য নয় বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নির্বাচনে মোবাইলের মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন বন্ধ করতে নয়টি সুপারিশ করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। সুপারিশগুলো হলো-
- নির্বাচনকালীন কোনো প্রার্থী কর্তৃক এমএফএস সেবার অপব্যবহার করে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার রোধে বড় অঙ্কের লেনদেন।
- একই ধরনের লেনদেনের পুনরাবৃত্তি ও সন্দেহজনক অস্বাভাবিক লেনদেন পর্যবেক্ষণপূর্বক শনাক্তকরণ এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে নির্বাচন কমিশন।
- বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে একটি বিশেষ টিম গঠন করা; আসন্ন নির্বাচনে এমএফএস সেবার অপব্যবহার রোধকল্পে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে মোবাইল কোর্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং নির্বাচনকালীন এমএফএস এজেন্ট ও মার্চেন্টধারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত নিরীক্ষণ করা।
- সন্দেহজনক অস্বাভাবিক লেনদেন পরিলক্ষিত হলে সন্দেহজনক হিসাবগুলো দ্রুততম সময়ে ফ্রিজ করা (যাতে টাকা উত্তোলন করতে না পারে)।
- নির্বাচনের দিন পর্যন্ত এমএফএসের সবধরনের হিসাবের লেনদেনের পরিমাণের ঊর্ধ্বসীমা অর্ধেকে নামিয়ে আনা।
- নির্বাচনকালীন এমএফএস ভিত্তিক অবৈধ অর্থ প্রবাহ রোধে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এজেন্টগুলোকে তাদের দৈনন্দিন লেনদেনের হিসাবের খাতার একটি কপি বাধ্যতামূলকভাবে এলাকাভিত্তিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ অফিসে প্রেরণে বাধ্য করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
- এমএফএস সেবা ব্যবহার করে ভোট ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িতদের গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ, ১৯৭২ (সংশোধিত ২০২৫) এর অধীনে বিচার নিশ্চিত করা।
- মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অপব্যবহার প্রতিরোধে মাঠ প্রশাসনের জন্য চেকলিস্ট বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
- নির্বাচনকালীন অবৈধ অর্থ লেনদেন (এমএফএস সেবা ব্যবহার করে) সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি সার্বক্ষণিক অভিযোগ সেল গঠন করা।
গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে পাঠানো প্রতিবেদন উপরের সুপারিশগুলো আসার পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘লেনদেনের সীমা কমানোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। যদি এমন কিছু করা হয়, তাহলে প্রজ্ঞাপন আকারে জানানো হবে।’