Thursday 11 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আসছে রেকর্ড বাজেট, গুরুত্ব পাবে যেসব বিষয়

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১১ জুন ২০২৬ ০৯:০৫

২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন এবং ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’ দর্শনকে সামনে রেখে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তার প্রথম বাজেট।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের জন্য এটি প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেটটি প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকার একে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের রূপরেখা’ হিসেবে তুলে ধরতে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট

নতুন সরকারের এই বাজেট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সর্বশেষ বাজেট ছিল ২০০৬-০৭ অর্থবছরে, যার আকার ছিল ৬৩ হাজার ১০ কোটি টাকা। আর ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময় প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নেতৃত্বে উপস্থাপিত বাজেটগুলোর আকার ছিল আনুমানিক ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। দুই দশক পর ফের বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে। তবে, অর্থনীতির আকার, সরকারি ব্যয় এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি বিবেচনায় এবারের বাজেট অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বড়।

রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা

প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, কর আদায় বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মাধ্যমে এই রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে এত বড় লক্ষ্য অর্জন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা

রাজস্ব আয়ের পরও প্রস্তাবিত বাজেটে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করতে পারে, যা বিনিয়োগ ও শিল্পোৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ঋণ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য বজায় রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে গুরুত্ব

এবারের বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চায় সরকার। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রচলিত নগদ সহায়তার পাশাপাশি কার্ডভিত্তিক সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ড

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রায় ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর প্রস্তাব থাকতে পারে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর করতে ডিজিটাল কার্ডভিত্তিক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কর্মসংস্থান ও প্রবাসী শ্রমবাজারে জোর

বেকারত্ব মোকাবিলা এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, দেশ-বিদেশে মিলিয়ে প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। বিশেষ করে বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে আরও বেশি সংখ্যক কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগও বাজেটে গুরুত্ব পাচ্ছে।

তরুণ উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ সহায়তা

তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে বাজেটে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফ্রিল্যান্সার ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এ খাতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে রাখা হতে পারে আরও ২২৫ কোটি টাকা। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ উদ্যোগ এবং উদ্ভাবনী ব্যবসা সম্প্রসারণে এসব তহবিল ব্যবহার করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এসএমই খাতের জন্য ২০০০ কোটি টাকার তহবিল

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় করতে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশ এসএমই খাতনির্ভর হওয়ায় এ খাতে অর্থায়ন বাড়ানো হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান উভয়ই বাড়বে।

করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ

জনসাধারণকে কিছুটা স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে কর কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন আনার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে। জ্বালানি তেল ও ভোজ্যতেলের ওপর কর হ্রাসের পাশাপাশি কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব আসতে পারে। ফলে বাজারে মূল্যচাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর সারচার্জ বাড়ানোর বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে, যাতে কর ব্যবস্থায় একটি তুলনামূলক ভারসাম্য আনা যায়।

‘বাংলাবিজ’ নামে একীভূত ডিজিটাল সেবা

ব্যবসা সহজীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির অংশ হিসেবে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি একীভূত ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় বিভিন্ন অনুমোদন, নিবন্ধন ও সরকারি সেবা নিতে পারবেন। এতে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নবম পে-স্কেলের জন্য বড় বরাদ্দ

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও বাজেটে প্রতিফলিত হতে পারে। এ জন্য প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পুনর্নির্ধারণের ফলে সরকারি ব্যয় বাড়লেও তা অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ

চলতি বছরের মে মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। আগামী অর্থবছরে এটি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নের ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাদের মতে, শুধু বাজেট নয়, এর সঙ্গে সমন্বিত মুদ্রানীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং রাজস্ব নীতির কার্যকর প্রয়োগও জরুরি।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা, ব্যাংক খাতের চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন সহজ হবে না। তাদের মতে, ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে বাজেট বাস্তবায়নেও চাপ তৈরি হবে। তবে তারা এও মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা এবং বাস্তবসম্মত ব্যয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাজেটকে কার্যকর করা সম্ভব।

নতুন গতির প্রত্যাশা

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগ জানিয়েছে, নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেটটি প্রস্তুত করা হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বাজেট দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে বলে সরকারের আশা।

সব মিলিয়ে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই বাজেট শুধু ব্যয়ের আকারে নয়, নীতি ও অগ্রাধিকারের দিক থেকেও নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, উচ্চ প্রত্যাশা নিয়ে প্রণীত এই বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষিত লক্ষ্য কতটা অর্জন করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর