ঢাকা: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা লেনদেন এবং বিদেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান জোরদার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তানজির আহমেদ জানান, নতুন অভিযোগগুলো চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।
মোহাম্মদ তানজির আহমেদ বলেন, ‘আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার করে বিলাসবহুল সম্পত্তি কেনা ও বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, বিভিন্ন জেলার ডিসি, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগসহ বিভিন্ন টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে মোটা অংকের কমিশন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা পদায়ন ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকার ঘুস বাণিজ্যের বিষয়টি চলমান অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
তিনি জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে আসিফের বিরুদ্ধে।
দুদক জানায়, একইভাবে ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগের পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ নেওয়া এবং এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে ৫২ কোটি টাকা ঘুসের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে ৬৫ কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করেছেন। হোটেল ওয়েস্টিনসহ পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস ও গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচারের দাবিও করা হয়েছে। এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এ সব অর্থ দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল ভিলা কেনা ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ করা হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগও রয়েছে। দুই বোন জামাই ও ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে তার নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। প্রকল্পটির বরাদ্দ ও গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। তার বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন। এ ছাড়াও, তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়া ঘুস লেনদেনের তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন মর্মে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
দুদক জানায়, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান।
এদিকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অনিয়মের অভিযোগে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে নতুন পদায়নের আদেশ জারির বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে দুদক জানিয়েছে। ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য ১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য আরও প্রায় ২ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে, গত ২ সেপ্টেম্বর নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকা লেনদেন এবং বিদেশে হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। এসব অভিযোগের পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা পদায়ন ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক।
অন্যদিকে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ। নিজের ফেসবুক পোস্টে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি লিখেন, অনুসন্ধানে বিদেশে কিছু পেলে তাকে যেন অন্তত ১০ শতাংশ দেওয়া হয়। কারণ, তার চলতে কষ্ট হচ্ছে।
কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়াই সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য দেওয়ায় তার সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে দাবি করে তিনি দুদককে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন এবং বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।