ঢাকা: দেশে বেশ কিছুদিন ধরেই অর্থনৈতিক সংকট চলছে। এই সংকট মেটাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও ফল তেমন একটা দৃশ্যমান না। বরং, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। একইভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যেরও সম্প্রসারণ হচ্ছে না। থমকে গেছে সামগ্রিক উৎপাদনও। কিন্তু, এর মধ্যেও দেশের ব্যাংক খাতে কোটি টাকার গ্রাহকের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এপ্রিল জুন প্রান্তিকে কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট বৃদ্ধির পরিমাণ ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। আর কোটি টাকার হিসাবে জমা বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে কোটি টাকার অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫ জন। আর জুন শেষে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২ জন। সেই হিসাবে তিন মাসে দেশের ব্যাংক খাতে কোটি টাকার অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭ জন। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪ জন। মূলত ডিসেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে কোটি টাকার হিসাবধারীর সংখ্যা। এমনকি সেই সঙ্গে এসব অ্যাকাউন্টে জমা টাকার পরিমাণও বেড়েছে।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, ‘পৃথিবীতে সম্পদ ও আয় বৈষম্যের অন্যতম দেশ হলো বাংলাদেশ। আমরা বহুবার পরামর্শ দিয়েছি যে, এই বৈষম্য দূর করতে হবে। একটা প্রোগ্রেসিভ করনীতি প্রণয়ন করতে। কিন্তু, সেটা করা হয়নি। সামনে হবে বলেও মনে হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট বাড়ার পেছনের অন্যতম একটা কারণ হলো চলমান করনীতি। কর আর ভ্যাট ফাঁকি বাড়ার কারণেই দিন দিন কোটি টাকার গ্রাহক সংখ্যা বাড়ছে। দেশে পরোক্ষ কর আদায় বাড়লেও সেই তুলনায় প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়েনি। আবার কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট সংখ্যা বাড়ার আরেকটা কারণ হলো রাজনৈতি প্রশ্রয়। বর্তমানে রাজনৈতি আশ্রয়-প্রশ্রয়েও অনেকে দ্রুত আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। তাদের তো সম্পদের হিসাব দিতে হয় না। এমনকি দুর্নীতিবাজ ও ঋণ খেলাপিদের কোনো জবাবদিহিতার মধ্যে আনা হয় না। বরং, উলটো পুরস্কার দেওয়া হয়।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে কোটি টাকার হিসাবে জমানো টাকার স্থিতি ছিল ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি। আর চলতি বছরের জুন শেষে এসব হিসাবে জমানো টাকার স্থিতি দাড়িয়েছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে কোটি টাকার হিসাবে জমানো টাকা বেড়েছে ১৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা।’
প্রতিবেদন আরও বলছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টি। আর চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট হিসাবের সংখ্যা দাড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮ টি। সেই হিসাবে তিন মাসে ব্যাংক খাতে মোট হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৩৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৭৩টি।
তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের উল্লিখিত হিসাবে মোট আমানতের স্থিতি ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৪ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের জুন শেষে মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে আমানত বেড়েছে ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোটি টাকার হিসাব মানেই কোটিপতি ব্যক্তির হিসাব নয়। কারণ, ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ রাখার তালিকায় ব্যক্তি ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। আবার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কতটি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। ফলে এক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির একাধিক অ্যাকাউন্টও রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কোটি টাকার হিসাবও রয়েছে।