ঢাকা: স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যে মেধাস্বত্ব অধিকার (আইপিআর) সুরক্ষার ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে ওষুধশিল্পে নতুন পেটেন্ট, ওষুধের দাম, প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার এবং বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ট্রিপসের (TRIPS) চেয়েও কঠোর শর্ত বা ‘ট্রিপস-প্লাস’ বাধ্যবাধকতা আসতে পারে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের বাজারে থাকা শীর্ষ ওষুধগুলোর বড় অংশের ক্ষেত্রে এলডিসি উত্তরণের কারণে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই।
এলডিসি উত্তরণের পর মেধাস্বত্বকে শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা বা কমপ্লায়েন্সের বিষয় হিসেবে না দেখে উদ্ভাবন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও পণ্যে মূল্য সংযোজনের চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইপিআর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, পৃথক আইপি ট্রাইব্যুনাল বা বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা, পেটেন্ট পরীক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল পাইরেসি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার(২১ সেপ্টেম্বর)ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) অডিটোরিয়ামে ‘Industrial Shift in the Post-LDC Era: Strategies for IPR Issues of Key Industries’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে এসব বিষয় উঠে আসে। সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও ডিসিসিআই যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের গবেষক মোহাম্মদ আতাউল করিম।
মূল উপস্থাপনায় বলা হয়, এলডিসি দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ট্রিপস চুক্তির বিভিন্ন সুবিধা ও নমনীয়তা পেয়ে আসছে। বাংলাদেশ ১৯৮৯ সালে এলডিসিগুলোর পক্ষে ট্রিপসের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কারিগরি সহায়তার দাবি জানিয়েছিল। পরে ট্রিপস চুক্তির ৬৬.১ ও ৬৬.২ ধারায় এলডিসিগুলোর জন্য বিভিন্ন সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে ট্রিপসের ন্যূনতম মানদণ্ড অনুযায়ী মেধাস্বত্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক, শিল্প নকশা, ট্রেড সিক্রেট ও কপিরাইটসহ বিভিন্ন ধরনের মেধাস্বত্ব রয়েছে। তবে ট্রিপসের আওতায় সদস্য দেশগুলোর জন্য কিছু নমনীয়তার সুযোগও রয়েছে।
উপস্থাপনায় ওষুধশিল্পের সম্ভাব্য প্রভাবকে তিন ভাগে দেখা হয়েছে। এর একটি হলো এলডিসি থেকে উত্তরণের আগে তৈরি হওয়া পেটেন্ট-সংক্রান্ত বিষয়, দ্বিতীয়টি উত্তরণের পর নতুন পেটেন্টের আওতায় আসা উদ্ভাবন এবং তৃতীয়টি মুক্ত বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির মাধ্যমে ট্রিপসের চেয়েও কঠোর মেধাস্বত্ব সুরক্ষার বিধান।
বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধের ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম বলে উপস্থাপনায় বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ওষুধবাজারের প্রায় ৮২ দশমিক ৮৫ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এমন শীর্ষ ৫০টি মলিকিউল বর্তমানে পেটেন্টমুক্ত। বাজারের শীর্ষ ২০টি ব্র্যান্ডও পেটেন্টমুক্ত। ফলে এলডিসি উত্তরণের পর এসব মলিকিউল ও ব্র্যান্ডের ব্যবহার অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়।
তবে কোনো মলিকিউলের নতুন কম্পোজিশন, নতুন ডোজ বা নতুন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন পেটেন্ট নেওয়ার বিষয়টি ভবিষ্যতে উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ২০২৩ সালের পেটেন্ট আইনে নতুন ব্যবহারসহ কিছু বিষয় পেটেন্টযোগ্যতার বাইরে রাখার বিধানের কথা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে পেটেন্ট বিধিমালা ও পরীক্ষার নির্দেশিকা কার্যকর করা এবং পেটেন্ট পরীক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিদেশি পেটেন্টেও তাৎক্ষণিক সংকট নয়
বাংলাদেশের স্থানীয় ওষুধের ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশি কোম্পানির পেটেন্টের আওতায় থাকতে পারে। একটি উদাহরণে ১০৮টি পণ্যের মধ্যে ১৪টি বা প্রায় ১৩ শতাংশ পেটেন্টের আওতায় থাকার তথ্য দেওয়া হয়।
তবে বিদেশে নিবন্ধিত কোনো পেটেন্ট বাংলাদেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না। মেধাস্বত্বের আঞ্চলিক বা টেরিটোরিয়াল নীতির কারণে বাংলাদেশে কোনো পেটেন্ট বৈধ না হলে তা দেশের বাজারে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করে না। এ কারণে বিদ্যমান ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না বলে উপস্থাপনায় বলা হয়েছে।
তবে ভবিষ্যতে নতুন করে পেটেন্ট হওয়া উদ্ভাবন ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোকে পেটেন্টধারীর অনুমতি নিতে হতে পারে। এ জন্য লাইসেন্স ও রয়্যালটি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
নতুন পেটেন্টে বাড়তে পারে ওষুধের দাম
পেটেন্টযুক্ত ওষুধের দাম জেনেরিক ওষুধের তুলনায় দুই থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে পেটেন্টের মাধ্যমে একচেটিয়া বাজারসুবিধা বাড়লে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, ভ্যাকসিন ও বায়োলজিক্যাল ওষুধের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এ পরিস্থিতিতে লাইসেন্সিং, রোগীদের জন্য অ্যাক্সেস প্রোগ্রাম, মূল্যভেদ, সরকারি সহায়তা, স্বাস্থ্যবীমা, সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগীর নিজস্ব ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ট্রিপসের আওতায় থাকা জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত নমনীয়তাগুলো ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ওষুধের দাম বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে সক্রিয় ওষুধ উপাদান বা এপিআইয়ের (API) খরচের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এপিআই আমদানির ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ আসে ভারত থেকে, ৪১ দশমিক ৫০ শতাংশ চীন থেকে এবং ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ অন্যান্য দেশ থেকে।
দেশে এপিআই উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়। একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, এপিআইয়ের খরচ ১০ শতাংশ বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও আনুমানিক ১০ শতাংশ বাড়তে পারে।
বাণিজ্য চুক্তিতে ‘ট্রিপস-প্লাস’ শর্তের ঝুঁকি
এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে মেধাস্বত্বের কঠোর শর্ত। উপস্থাপনায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়।
এ ধরনের চুক্তিতে ট্রিপসকে ন্যূনতম মানদণ্ড হিসেবে ধরে আরও কঠোর মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, পেটেন্ট ও ট্রেডমার্ক-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগদান, সীমান্ত ও কাস্টমস পর্যায়ে কঠোর প্রয়োগ এবং ডিজিটাল পরিবেশে মেধাস্বত্ব সুরক্ষার মতো বিষয় থাকতে পারে।
সফটওয়্যার, কৃষি ও পোশাকেও প্রভাব
ওষুধশিল্পের পাশাপাশি সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও এলডিসি উত্তরণের পর মেধাস্বত্বের প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে ব্যবহৃত আইপি-সুরক্ষিত সফটওয়্যার, ভবিষ্যতের কপিরাইট ও পেটেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর উদ্ভাবন ও আইটি অবকাঠামোকে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কৃষি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও পেটেন্ট ও উদ্ভিদ জাত সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বীজ ও উদ্ভিদ প্রজননকারীদের অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি কৃষকের প্রচলিত অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
ফ্যাশন ও তৈরি পোশাক এবং প্লাস্টিক ও খেলনা শিল্পেও শিল্প নকশার সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হবে। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত নকশার সুরক্ষা এবং নকশা নকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
কপিরাইটের ক্ষেত্রে বই শিল্প, শিক্ষা ও গবেষণা এবং বর্তমানে প্রচলিত ‘নীলক্ষেত মডেল’-এর ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়। শিক্ষা ও গবেষণার জন্য কপিরাইটের ব্যতিক্রমের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরা হয়।
আইপিআর ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রস্তাব
আলোচনায় দেশের আইপিআর ব্যবস্থার কয়েকটি সীমাবদ্ধতার কথা উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দীর্ঘসূত্রতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, পাইরেসি ও নকল পণ্য প্রতিরোধে সীমিত সক্ষমতা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে আইপিআর সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি।
বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করে একটি আধুনিক ও কার্যকর ‘Intellectual Property Office of Bangladesh (IPOB)’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামে আইপি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক আইপি ট্রাইব্যুনাল বা আইপি বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা এবং কাস্টমস ও পুলিশের জন্য বিশেষায়িত আইপিআর প্রশিক্ষণের সুপারিশ করা হয়।
Department of Patents, Designs and Trademarks (DPDT)-এর নিবন্ধন ও পরীক্ষা প্রক্রিয়ার ডিজিটাল ব্যাকলগ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফার্মাসিউটিক্যালস ও বায়োটেকনোলজির মতো বিশেষায়িত খাতের জন্য দক্ষ ও বিশেষায়িত পরীক্ষক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে Technology Transfer Office (TTO) গঠন এবং শিল্প ও গবেষকদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে গবেষণালব্ধ উদ্ভাবন শিল্পে ব্যবহার ও বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ বাড়বে বলে আলোচনায় বলা হয়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে আইপিআরের অর্থনৈতিক মূল্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং আইপিআরভিত্তিক ব্যবসায় অর্থায়নের সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ডিজিটাল পাইরেসি মোকাবিলায় কপিরাইট আইন ও সংশ্লিষ্ট সাইবার বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকর ‘Notice and Takedown’ ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়।
উদ্ভাবন উৎসাহিত করতে শুধু মেধাস্বত্বের ওপর নির্ভর না করে পুরস্কার, কর ছাড়, সরকারি অনুদান ও ঋণ, সরকারি অর্থায়ন এবং স্থানীয় উদ্ভাবন সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে ব্যবহারের মতো উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের উদ্ভাবন ও আইপি নীতির ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন, প্রভাব মূল্যায়ন, তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিল্প খাতে আইপি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, মেধাস্বত্ব সৃষ্টি ও বাণিজ্যিকীকরণ এবং শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, এলডিসি উত্তরণের পরের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথমেই বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত, তা নির্ধারণ করা জরুরি। অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করার পাশাপাশি নিজেদের সক্ষমতা কতটা বাড়ানো সম্ভব, সেটিও বুঝতে হবে। এজন্য বর্তমান ও ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যাবে—এমন সম্ভাব্য উপায়গুলো চিহ্নিত করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে বংশপরম্পরায় চলে আসা অনেক পণ্য, বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি ও কারুশিল্পের সঙ্গে মেধাস্বত্বের বিষয়টি জড়িত। এসব নিজস্ব জ্ঞান ও ঐতিহ্যকে কীভাবে মেধাস্বত্বের আওতায় আনা যায়, তা নিয়ে কাজ করতে হবে। চীন ও কোরিয়া নিজেদের ‘ন্যারেটিভ’ নিয়ে কাজ করছে; বাংলাদেশকেও নিজস্ব ন্যারেটিভ তৈরি করতে হবে।
ইআরডি সচিব বলেন, বাংলাদেশের একদিকে আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্য আইনি দক্ষতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনার সময় অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনি দক্ষতা ও অন্যান্য সক্ষমতায় ঘাটতি দেখা যায়। সরকার এসব ঘাটতি পূরণে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর সব সুযোগ-সুবিধা হারিয়ে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, সরকার কীভাবে প্রস্তুতি নেবে, সে বিষয়ে রোডম্যাপ ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের জন্যও একটি খসড়া রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছিল। এ কাজে এফবিসিসিআই ও বিসিসিআই সহযোগিতা করেছে। তবে এগুলো চূড়ান্ত কোনো দলিল নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা যাবে। এগুলোকে ‘লিভিং ডকুমেন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, দেশের নিজস্ব চাহিদা ও প্রয়োজনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান ও উত্তম চর্চার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। নিজেদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পরবর্তী ধাপে এগোতে হবে।
ইআরডি সচিব বলেন, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে বিরোধ থাকবেই। তবে সেখান থেকে উত্তরণের পথ বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার সব ধরনের অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে পরামর্শ করতে চায়। আলোচনার মাধ্যমে উঠে আসা সমস্যাগুলোর সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে এসএমই খাতকে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু নীতিগত সহায়তার ক্ষেত্রে এসএমইকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে আরও কাজ করতে হবে। স্বর্ণ-রৌপ্য, চামড়া, কামারশিল্পসহ বংশপরম্পরায় চলে আসা বিভিন্ন ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের সুযোগ
শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে। পণ্যের নকশায় সামান্য পরিবর্তন ও মানের উন্নয়ন করতে পারলে এসব শিল্পের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গবেষণা খাতে অর্থের অভাবের পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহার করতে না পারার বিষয়টিও দেখতে হবে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, অর্থের বরাদ্দ থাকার পরও অনেক প্রতিষ্ঠান তা ব্যবহার করতে পারছে না। তাই কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কীভাবে সেই ঘাটতি পূরণ করা যায়, তা নিয়ে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, সরকার ইতিমধ্যে এসএমই খাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ফান্ড ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি ফার্মাসিউটিক্যালস খাত নিয়েও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। তবে যেকোনো সহায়তা কর্মসূচির ক্ষেত্রে অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও স্থায়িত্বের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
ইআরডি সচিব বলেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগকে সমন্বয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে আছে। তাই রোডম্যাপ ও অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী প্রতিটি খাত ও বিভাগ—সরকারি ও বেসরকারি—নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করা হবে।
তিনি বলেন, এসব আলোচনার মাধ্যমে কোথায় পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযোজন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী আইন, বিধি ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা হবে। সরকার যে টাস্কফোর্স গঠন করেছে, তার দায়িত্ব অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ স্বাগত বক্তব্য দেন। আলোচনায় অংশ নেন ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ফায়েজ আহমেদ, ব্রেইন স্টেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রইসুল কবির, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইপিএবি) মহাপরিচালক মো. আজিজুর রহমান এফসিএস, বিজিএমইএর মহাসচিব মেজর জেনারেল (অব.) মো. শফিউল ইসলাম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবুরেজা এম মুজাররেবা, প্রকল্প উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব আবদুল বাকি, কপিরাইট রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত সচিব) এস এম আরশাদ ইমাম এবং ডিপিডিটির মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।
আলোচনায় সামগ্রিকভাবে বলা হয়, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শুধু উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নির্ভর করবে না। দেশ কতটা উদ্ভাবন করতে পারছে এবং সেই উদ্ভাবনের মালিকানা ও বাণিজ্যিক মূল্য কতটা কার্যকরভাবে সুরক্ষিত করতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই মেধাস্বত্ব ব্যবস্থাকে শুধু কমপ্ল্য়ায়েন্সের বিষয় না দেখে শিল্পনীতি, উদ্ভাবন, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।