ঢাকা: চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত অর্থবছরের তুলনায় এ লক্ষ্য ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। তবে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে কৃষিঋণ বিতরণে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। জুনের তুলনায় জুলাইয়ে বিতরণ কমেছে ৪৪ শতাংশের বেশি। যদিও গত বছরের একই মাসের তুলনায় বিতরণ বেড়েছে ২৩ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই ২০২৬-এর ‘কৃষি ও পল্লি অর্থায়ন’ বিষয়ক মাসিক প্রতিবেদন’ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে তফসিলি ব্যাংকগুলো কৃষিঋণ বিতরণ করেছে ২ হাজার ৬৫৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা। গত জুনে বিতরণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭৫৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে বিতরণ কমেছে ২ হাজার ৯৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে বিতরণ হয়েছিল ২ হাজার ১৫৪ কোটি ৩ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। এবার সেই বাস্তব বিতরণের তুলনায়ও লক্ষ্যমাত্রা ৪০ দশমিক ০৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে কৃষিঋণের সবচেয়ে বেশি অংশ বিতরণ হয়েছে শস্য খাতে। জুলাইয়ে বিতরণ করা কৃষিঋণের ৪০ দশমিক ৪৭ শতাংশ গেছে এ খাতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৪ দশমিক ৯০ শতাংশ ঋণ গেছে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনে। মৎস্য খাতে বিতরণ হয়েছে ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং দারিদ্র্য বিমোচন খাতে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অন্যান্য খাতে বিতরণ হয়েছে ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
গত বছরের একই মাসে শস্য খাতে কৃষিঋণের অংশ ছিল ৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে এ খাতে ঋণের অংশ বেড়েছে ১ দশমিক ৯৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি খাতের অংশ বেড়েছে শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশীয় পয়েন্ট।
অন্যদিকে, মৎস্য খাতে ঋণের অংশ কমেছে ১ দশমিক ৪১ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং দারিদ্র্য বিমোচন খাতে কমেছে শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে শস্য খাতে ঋণের অংশ বাড়ার পেছনে আমন ধান চাষসহ মৌসুমি ফসলের উৎপাদনচক্র এবং আগাম শীতকালীন ফসলের প্রস্তুতির বিষয়টি রয়েছে। পাশাপাশি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনে ঋণের অংশ বাড়া গ্রামীণ জীবিকায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
কৃষিঋণ বিতরণের পাশাপাশি ঋণ আদায়েও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাইয়ে তফসিলি ব্যাংকগুলো কৃষিঋণ আদায় করেছে ৩ হাজার ৫২০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। গত বছরের একই মাসে আদায় হয়েছিল ২ হাজার ৯৫৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে আদায় বেড়েছে ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ।
তবে গত জুনে কৃষিঋণ আদায়ের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ১৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে আদায় কমেছে ৪১ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের একই মাসের তুলনায় কৃষিঋণ আদায় বাড়ার পেছনে বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বেশি আদায় ভূমিকা রেখেছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা কৃষিঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৮৬৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সুদও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গত বছরের জুলাই শেষে এ স্থিতি ছিল ৫৯ হাজার ৪৭০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এক বছরে কৃষিঋণের স্থিতি বেড়েছে ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ।
তবে ঋণের স্থিতি বাড়লেও মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষিঋণের পরিমাণ কমেছে। জুলাই শেষে কৃষিঋণের মেয়াদোত্তীর্ণ বা বকেয়া স্থিতি ছিল ২২ হাজার ৩৬৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৮০৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষিঋণ কমেছে ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষায়িত ব্যাংক ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ কমায় সামগ্রিক বকেয়া ঋণেও হ্রাস এসেছে। তবে প্রতিবেদনে ঋণ শ্রেণীকরণের পরিবর্তনের প্রভাবের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে তফসিলি ব্যাংকগুলোর জন্য নির্ধারিত ৬০ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ৬ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর লক্ষ্যমাত্রা ১৩ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। আর বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ মোট লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশই বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে কৃষকদের কাছে ঋণ পৌঁছানোর পাশাপাশি ঋণের যথাযথ ব্যবহার ও আদায় নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) জন্য চলতি অর্থবছরে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫০৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। জুলাইয়ে সংস্থাটি ১১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা বিতরণ করেছে। গত বছরের একই মাসে বিতরণের পরিমাণ ছিল ৯৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। সে হিসাবে বিতরণ বেড়েছে ২১ দশমিক ১০ শতাংশ।
জুলাইয়ে বিআরডিবির ঋণ আদায় হয়েছে ১২৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের (বিএসবিএল) চলতি অর্থবছরে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ২৫ কোটি টাকা হলেও জুলাইয়ে কোনো ঋণ বিতরণ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ মাসে আগের ঋণ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৫ লাখ টাকা। উচ্চমাত্রার মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের কারণে প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক ঋণ কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষি খাতে অর্থায়ন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন সুবিধাও চালু রেখেছে। জুলাই মাসে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) অনুকূলে সরকারের গ্যারান্টির আওতায় স্বল্পমেয়াদি কৃষি পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার নতুন কোনো অর্থ অনুমোদন করা হয়নি।
তবে রাকাবের অনুকূলে এক বছরের জন্য ৪ শতাংশ ব্যাংক হারে ১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা অনুমোদিত রয়েছে। জুলাইয়ে এ ঋণের সুদ বাবদ রাকাব ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।
জুলাই ২০২৬ শেষে বিকেবি ও রাকাবের পুনঃঅর্থায়ন-সংশ্লিষ্ট বকেয়া স্থিতি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ১ হাজার ৭৯০ কোটি ৯২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া কৃষিপণ্যের উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি কার্যক্রম শক্তিশালী করতে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উত্তরাঞ্চলের কৃষি মূল্যশৃঙ্খল উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠিত এ তহবিলের মেয়াদ প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে তিন বছর।
বার্ষিক কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জনের উদ্দেশ্যে তফসিলি ব্যাংকগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি উন্নয়ন তহবিলও গঠন করেছে।
কৃষিঋণের পাশাপাশি পল্লি অর্থায়নে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমও বড় আকারে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে গ্রামীণ ব্যাংক ও ১০টি বড় বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) মিলে ১৮ হাজার ৫৬৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করেছে। গত বছরের একই মাসের তুলনায় এ বিতরণ বেড়েছে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ।
একই মাসে এসব প্রতিষ্ঠান ঋণ আদায় করেছে ১৮ হাজার ৬২১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় আদায় বেড়েছে ১০ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
জুলাই শেষে গ্রামীণ ব্যাংক ও ১০টি বড় এনজিওর বিতরণ করা ক্ষুদ্রঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬১৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর বিপরীতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ৪৯৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণস্থিতির ৬ দশমিক ২৭ শতাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ।
এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ সদস্য ১৪ হাজার ৫৬১টি শাখার মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। জুলাইয়ে মোট ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের ৬৯ দশমিক ১১ শতাংশ এসেছে গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক ও আশা থেকে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্র্যাক জুলাইয়ে ৬ হাজার ৬৬৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করেছে। একই সময়ে আশা বিতরণ করেছে ৩ হাজার ৫১৬ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং গ্রামীণ ব্যাংক বিতরণ করেছে ২ হাজার ৬৪৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
তবে ক্ষুদ্রঋণে বকেয়ার পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ক্ষুদ্রঋণ থেকে বোঝা যায়, ঋণগ্রহীতাদের একটি অংশ পরিশোধের চাপে রয়েছে। গ্রামীণ আয়ের মৌসুমি ওঠানামা কিংবা পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তাঁদের নগদ অর্থপ্রবাহে সাময়িক সংকট তৈরি হতে পারে। এ কারণে ঋণ আদায়, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং ঋকিঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নজরদারি অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সব মিলিয়ে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে কৃষিঋণ বিতরণ ও আদায়—দুটিই গত বছরের একই মাসের তুলনায় বেড়েছে। তবে আগের মাসের তুলনায় উভয় ক্ষেত্রেই কমতি রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিঋণের মোট স্থিতি বাড়লেও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ কমেছে। নতুন অর্থবছরে বড় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে কৃষকদের কাছে সময়মতো ঋণ পৌঁছানো এবং ঋণের টাকা উৎপাদনমূলক কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে ব্যাংকগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।