ঢাকা: ব্যাংক খাতে অতীতে বিধি-বিধান অতিরিক্ত শিথিল করার কারণেই বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
তিনি বলেন, বর্তমানে অর্থনীতির যে শ্লথ গতি এবং ব্যাংক ও শিল্প খাতের তারল্য সংকট চলছে, তা থেকে উত্তরণে অনেকেই নিয়ম-কানুন শিথিল করার কথা বলছেন। অতীতে বিধি-বিধান অতিরিক্ত শিথিল করার কারণেই বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। অসাধারণ পরিস্থিতিতে অসাধারণ পদক্ষেপ নিতে হয়। তাই সংকট উত্তরণে নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হলেও তা যেন পুনরায় লুটপাট বা অনিয়মের সুযোগ তৈরি না করে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত সুরক্ষাকবচ বা ‘সেফগার্ড’ নিশ্চিত করতে হবে। সৎ ও প্রকৃত উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে তাদেরই সহায়তা দিতে হবে।
বুধবার(২৮ অক্টোবর) ১১ তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর মিরপুরে নিজস্ব অডিটোরিয়ামে দু’দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)। সম্মেলনের গণমাধ্যম সহযোগী হিসেবে আছে বণিক বার্তা।
অনুষ্ঠানে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা ছাড়া বেসরকারি খাতের ব্যাংক অনুমোদন দিয়েই আমরা ভুলপথে যাত্রা শুরু করেছিলাম। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকের উদারীকরণ এবং বেসরকারি খাতের ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই আমরা নানা বিতর্ক ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। অতীতে কোন ভুলগুলো করা হয়েছিল এবং এর পরিণতি কী হয়েছিল, তা বর্তমান নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকিং খাতের অতীতের সংকট, সংস্কারের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রেসক্রিপশন অন্ধভাবে অনুকরণ না করে দেশের নিজস্ব বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাংকিং খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে।
তিনি বলেন, প্রথমবার দেশের ব্যাংখাতের সংস্কৃতি নষ্ট হয়েছে ঋণ খেলাপির মাধ্যমে। দ্বিতীয়বার নষ্ট হয়েছে ব্যাংক লুটপাটের মাধ্যমে। এটি আরো বেশি মারাত্মক।
ব্যাংকিং খাতের উত্থান-পতনের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, নব্বইয়ের দশকের সংস্কারের পর বেসরকারি খাতের বেশ কয়েকটি ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে পেরেছিল। কিন্তু ২০১০ সাল পরবর্তী সময়ে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই যত্রতত্র নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ায় খাতের আবারও এ খাতের অবনতি ঘটে।
তবে শুধু নীতিমালা তৈরির মাধ্যমে ব্যাংখাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয় বলেও মনে করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, শুধু আইন বা রেগুলেশন দিয়ে যে ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। ব্যাংকিং, করপোরেট ও শিল্প খাতের সবার মধ্যে ন্যূনতম নৈতিকতা থাকা আবশ্যক।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদী সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থার উন্নতি হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার বারবার ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক সরকারগুলোর ‘পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি’ বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো অন্যায় সুযোগ বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থনীতির হৃদপিণ্ডতুল্য এই আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে রাখতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিকল্প নেই।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অধিবেশনে সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন, বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেম প্রমুখ।