যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্স পাঠিয়ে ভেনেজুয়েলার রাজধানীর কেন্দ্রস্থল থেকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিয়ে গিয়ে থাকে, তবে তা হবে আধুনিক ইতিহাসে একেবারেই নজিরবিহীন ঘটনা। কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের কার্যরত প্রেসিডেন্টকে নিজ দেশের রাজধানী থেকে সরাসরি ধরে নেওয়ার ঘটনা আগে দেখা যায়নি।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এর সবচেয়ে কাছাকাছি উদাহরণ পাওয়া যায় ১৯৮৯ সালে পানামার নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে আটক করার ঘটনায়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর অভিযানে নোরিয়েগাকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
মাদুরো ও নোরিয়েগার মধ্যে বেশ কিছু মিলের কথাও তুলে ধরছেন পর্যবেক্ষকরা। দুজনই বিতর্কিত নির্বাচনে বিজয়ের দাবি করেছিলেন, দুজনের বিরুদ্ধেই যুক্তরাষ্ট্র মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছিল এবং দুজনের ক্ষেত্রেই অভিযানের আগে উল্লেখযোগ্য মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
তবে একটি বড় পার্থক্যও রয়েছে। নোরিয়েগাকে আটক করা হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি কিন্তু পরিকল্পিত এক যুদ্ধের পর। সে যুদ্ধে পানামার বাহিনী দ্রুত পরাজিত হয়। নোরিয়েগা তখন ভ্যাটিকানের দূতাবাসে আশ্রয় নেন এবং সেখানে ১১ দিন অবস্থান করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনি প্রস্তুতি বহু পুরোনো
মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আইনি প্রক্রিয়া নতুন নয়। ২০২০ সালে তার বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল আদালতে মাদক পাচার, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসে সহযোগিতার অভিযোগে মামলা করা হয়। সে সময় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ঘোষণা দিয়েছিল মাদুরোকে গ্রেফতার বা দোষী সাব্যস্ত করতে সহায়ক তথ্য দিলে ৫ কোটি ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের ধারণা, সাম্প্রতিক অভিযানের পেছনে দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা ও আইনি প্রস্তুতির প্রতিফলন রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য অস্থিরতা
মাদুরোকে আটক করার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ দেশজুড়ে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি এটিকে দেশের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছেন।
এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভেনেজুয়েলায় অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়তে পারে এবং লাতিন আমেরিকায় নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
মাদুরোর ভবিষ্যৎ কোথায়?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিকোলাস মাদুরোর পরিণতি কী? যদি তাকে সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে করা পুরোনো মামলাগুলোই বিচারের মূল ভিত্তি হবে। সে ক্ষেত্রে তার শেষ ঠিকানা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ফেডারেল কারাগার।
আর যদি এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের সীমা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রকেও কঠিন কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
একটি বিষয় নিশ্চিত মাদুরোকে আটক করার ঘটনা শুধু একটি দেশের শাসক পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি বিশ্বরাজনীতিতে শক্তি, সার্বভৌমত্ব ও আইনের সীমা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।