ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করার ঘটনাটি শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ অপারেশন। এই অভিযানের মাধ্যমে ওয়াশিংটন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল লাতিন আমেরিকায় নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় তারা সরাসরি শক্তি প্রয়োগে পিছপা নয়।
কেন ডেল্টা ফোর্স
এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করেছে তাদের অভিজাত বিশেষায়িত বাহিনী ডেল্টা ফোর্স। সিএনএনকে দেওয়া একাধিক সূত্র জানায়, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, জিম্মি উদ্ধার ও ‘হাই ভ্যালু টার্গেট’ ধরার ক্ষেত্রে ডেল্টা ফোর্সই মার্কিন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ইউনিট।
Maduro perp walk. pic.twitter.com/e1Maaun5EK
— Paul Mauro (@PaulDMauro) January 4, 2026
১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড (JSOC)-এর অধীনে কাজ করে। নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থিত এই ইউনিটে রয়েছে আটটি পূর্ণাঙ্গ অপারেশনাল স্কোয়াড্রন যেগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে হামলা চালাতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর মতো রাষ্ট্রপ্রধানকে ধরতে হলে কেবল সামরিক শক্তি নয়, প্রয়োজন ছিল নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্য, সুনির্দিষ্ট সময় নির্বাচন এবং অভিজাত বাহিনীর সমন্বিত অভিযান যা ডেল্টা ফোর্স ছাড়া অন্য কোনো ইউনিটের পক্ষে বাস্তবায়ন করা কঠিন।
কয়েক মাসের প্রস্তুতি
যদিও অভিযানটি আকস্মিক বলে মনে হয়েছে, বাস্তবে এটি কয়েক মাস ধরে পরিকল্পিত ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়—
মাদুরোর ‘সেফ হাউস’-এর হুবহু প্রতিকৃতি তৈরি করে সেখানে নিয়মিত মহড়া চালানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি ছোট দল গত আগস্ট থেকেই ভেনেজুয়েলায় অবস্থান করছিল। এটিও জানা যায় মাদুরোর ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি সিআইএর ‘অ্যাসেট’ হিসেবে তার গতিবিধি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য দিচ্ছিল
এই গোয়েন্দা প্রস্তুতির ফলে অভিযানের সময় মাদুরোর অবস্থান নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না।
সবুজ সংকেত ও সামরিক মোতায়েন
চার দিন আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানের অনুমোদন দেন। তবে সামরিক পরিকল্পনাকারীরা অপেক্ষা করেন অনুকূল আবহাওয়া ও পরিষ্কার আকাশের জন্য।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে ট্রাম্প ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।
এই অভিযানের আড়ালে ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়, যা প্রকাশ্যে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। বাস্তবে সেখানে ছিল— একটি বিমানবাহী রণতরি, ১১টি যুদ্ধজাহাজ, এক ডজনের বেশি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, মোট ১৫ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল মনোযোগ ঘোরানোর কৌশল যাতে মূল অভিযানের প্রস্তুতি আড়ালেই থাকে।
শোবার ঘর থেকে আটক
বিমান হামলার মধ্যেই ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন স্পেশাল ফোর্স কারাকাসে প্রবেশ করে। মাদুরোর কম্পাউন্ডে ঢোকার জন্য ইস্পাতের দরজা কাটার প্রস্তুতিও ছিল।
জেনারেল কেইনের তথ্যমতে, শনিবার ভোরের দিকে মার্কিন বাহিনী মাদুরোর কম্পাউন্ডে পৌঁছায়। সেখানে গুলির মুখে পড়লেও অভিযান ব্যাহত হয়নি।
সিএনএনের বরাতে জানা যায়, মাদুরো ও তার স্ত্রীকে মধ্যরাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের শোবার ঘর থেকেই টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ট্রাম্প নিজে এই স্থানটিকে ‘অত্যন্ত সুরক্ষিত দুর্গ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মাদুরো একটি ‘সেফ রুমে’ ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দরজা বন্ধ করার আগেই তাকে আটক করা হয়।
পরিণতি ও বার্তা
অভিযানে কয়েকজন মার্কিন সেনা আহত হলেও কেউ নিহত হননি। ভেনেজুয়েলার সীমানা ছাড়ার সময়ও মার্কিন বাহিনী একাধিক আত্মরক্ষামূলক সংঘর্ষে জড়ায়।
ভোর ৩টা ২০ মিনিটে উড়োজাহাজ মাদুরো দম্পতিকে নিয়ে আন্তর্জাতিক জলসীমায় পৌঁছায়। কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরা মাদুরোর ছবি প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ছবি শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানের পতনের চিত্র নয়, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের রাজনৈতিক বার্তা। বার্তাটি স্পষ্ট— ওয়াশিংটনের চোখে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হলে রাষ্ট্রপ্রধান হওয়াও নিরাপদ নয়।