স্পেনে দ্রুতগতির দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ২১ জন নিহত এবং ৭০-এর বেশি আহত হয়েছেন। স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, গুরুতর আহত ৩০ জনেরও বেশি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
দেশটির জরুরি সেবা বিভাগের বরাত দিয়ে বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় রোববার (১৮ জানুয়ারি) দক্ষিণ স্পেনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
স্পেনের রেল কর্তৃপক্ষ অ্যাডিফ নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী একটি দ্রুতগতির ট্রেন আদামুজ শহরের কাছে লাইনচ্যুত হয়। তা বিপরীত লাইনে ঢুকে উল্টো দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনকে ধাক্কা দেয়। ফলে ওই ট্রেনটিও লাইনচ্যুত হয়।
পুলিশের এক মুখপাত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে প্রাথমিকভাবে পাঁচজন নিহত হওয়ার কথা জানান। কিন্তু পরে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২১।
আন্দালুসিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের জরুরি সেবা বিভাগের প্রধান আন্তোনিও সানজ জানান, দুর্ঘটনায় অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন। স্পেনের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, অনেক যাত্রী ট্রেনের বগিতে আটকা পড়েছেন। তাদের নিয়ে আহতের সংখ্যা বেড়ে ১০০-তে পৌঁছাতে পারে।
কর্ডোবা অঞ্চলের ফায়ার সার্ভিসের প্রধান ফ্রান্সিসকো কারমোনা রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচার মাধ্যমে আরটিভিইকে বলেন, ‘সমস্যা হলো-বগিগুলো দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। ধাতু মচকে গেছে। এর মধ্যে মানুষ আটকা পড়ে আছে। আটকা পড়া কোনো ব্যক্তিকে উদ্ধার করতে আমাদের হয়তো কোনো মৃত ব্যক্তিকে সরিয়ে জায়গা করতে হচ্ছে। এটা খুব কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।’
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, প্রথম ট্রেনের একটি বগি সম্পূর্ণভাবে উল্টে গিয়েছিল। টেলিভিশনে ঘটনাস্থলে চিকিৎসক ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের কর্মব্যস্ত দেখা গেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচার মাধ্যম আরএনই’র এক সাংবাদিক দুর্ঘটনাকবলিত দুই ট্রেনের একটি ছিলেন। তিনি বলেন, সংঘর্ষের মুহূর্ত তার কাছে ‘ভূমিকম্পের মতো’ মনে হয়েছে। আটকা পড়া যাত্রীরা জরুরি হাতুড়ি দিয়ে বগির জানালা ভেঙে বের হতে চেষ্টা করেন।
মালাগা থেকে যাত্রা পরিচালনাকারী একটি বেসরকারি রেল কোম্পানি ইরিও জানিয়েছে, দুই ট্রেন মিলিয়ে প্রায় ৪০০ জন যাত্রী ছিলেন। এর মধ্যে প্রথম লাইনচ্যুত হওয়া ট্রেনটিতে প্রায় ৩০০ জন যাত্রী ছিলেন, অন্যদিকে রেনফে পরিচালিত অন্য ট্রেনটিতে প্রায় ১০০ জন যাত্রী ছিলেন।
পরিবহনমন্ত্রী পুয়েন্তে আরও বলেন, ঘটনাটি ‘অত্যন্ত অদ্ভুত’ বলে মনে হচ্ছে, কারণ ট্রেনটি গত বছরের মে মাসে সংস্কার করা একটি সোজা লাইনের উপর লাইনচ্যুত হয়েছে।
দুর্ঘটনার আসল কারণ এখনও জানা যায়নি। গত এক মাসে ঠিক কি হয়েছে তা তদন্ত করে বের করা যাবে কিনা সেটাও নিশ্চিত নয়।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন যে এই রাতটি দেশটির জন্য ‘গভীর যন্ত্রণার রাত’।
দুর্ঘটনাস্থলে প্রথম উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন আদামুজের মেয়র রাফায়েল মোরেনো। তিনি এই দুর্ঘটনাকে ‘দুঃস্বপ্ন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এক্স-এর একটি পোস্টে, আন্দালুসিয়ার জরুরি সংস্থা দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া সবাইকে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্য অনুরোধ করেছে যে তারা বেঁচে আছেন।
দুর্ঘটনার কারণে মাদ্রিদ, সেভিয়া, কর্ডোবা, মালাগা ও হুয়েলভা রুটের উচ্চগতির ট্রেনসেবা অন্তত সোমবার পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ অ্যাডিফ। এসব শহরের স্টেশন ভুক্তভোগীদের পরিবার ও স্বজনদের সহায়তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
রাজ প্রাসাদ এক্সে এক বার্তায় জানিয়েছে, রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ ও রানি লেতিসিয়া এ দুর্ঘটনায় ‘গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করেছেন। তারা হতাহতদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।
স্পেনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার, যা ইউরোপে সবচেয়ে বড়। পৃথক ট্র্যাকে এ নেটওয়ার্ক মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, সেভিয়া, ভ্যালেন্সিয়া এবং মালাগাসহ দেশটির প্রধান শহরগুলোকে যুক্ত করেছে।