ইয়েমেনের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখলের পর লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত ময়উন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে হুতিদের সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইয়েমেনের এক সরকারি কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ময়উন দ্বীপ থেকে সরকারি বাহিনী প্রত্যাহারের পর হুতি যোদ্ধাদের বহনকারী নৌকা সেখানে পৌঁছায়। এরপর দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা।

বাব আল–মান্দেব প্রণালি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি বাহিনী আগে থেকেই ‘মোখা’ এলাকা থেকে সরে যাওয়ায় হুথি যোদ্ধারা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় খুব সামান্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। তারা প্রথমে ‘দুবাব’ এবং পরে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বশেষ উপকূলীয় শহর ‘মুরাদ’ সহজেই নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়।
উপকূলীয় এসব এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হুথিদের নৌবাহিনী সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। ইতিমধ্যে তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির মায়্যুন দ্বীপ দখল করে নিয়েছে।
এরপর তারা জুকাল দ্বীপেও প্রবেশ করে, যেখানে বর্তমানে সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
এক প্রত্যক্ষদর্শী আলজাজিরাকে জানান, বাব আল-মানদেব উপকূলজুড়ে সশস্ত্র হুতিদের মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। সামরিক যান নিয়েও তাদের টহল দিতে দেখা যায়।
গত সপ্তাহে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে হুতিরা। কয়েক দিনের লড়াইয়ের পর বৃহস্পতিবার তারা মোখা শহর ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরপর হুতিরা ধুবাব ও বাব আল-মানদেবের দিকে দক্ষিণে অগ্রসর হয়। শুক্রবার তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির মায়্যুন দ্বীপ দখল করে নেয়।
ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি বলেছেন, মোখা ও বাব আল-মানদেবের পরিস্থিতি শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িত।
প্রসঙ্গত, বাব আল-মানদেব প্রণালি ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল এবং আফ্রিকার জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। প্রায় ২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই নৌপথ দিয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খাল এবং সেখান থেকে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন হয়। ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশ।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিধিনিষেধের কারণে বাব আল-মানদেবের গুরুত্ব সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেড়েছে। আলজাজিরার জানায়, মার্চ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাব আল-মানদেব দিয়ে সৌদি আরবের সমুদ্রপথে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮ গুণ বেড়েছিল।
এদিকে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজে হুতি হামলার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। গত আগস্টেও প্রণালির কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হুতি হামলায় ছয়জন নিহত ও ১০ জন আহত হন বলে জানিয়েছে ইয়েমেন সরকার।
অন্যদিকে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরবও বিমান হামলা চালিয়েছে। হুতি পরিচালিত আল-মাসিরা টিভির দাবি, মোখা এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দরেও দুই দফা হামলা হয়েছে। নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে ইতিমধ্যে হাজারো পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ হাজার ৪০০টির বেশি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক দূত সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির সংঘাত এখন ‘বিপজ্জনক পর্যায়ে’ প্রবেশ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোখা ও ময়উন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে বাব আল-মানদেবের গুরুত্বপূর্ণ অংশে হুতিদের সামরিক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।