Monday 05 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

একবছরে নেই ক্রসফায়ার-গুম, র‌্যাব কি জনআস্থায় ফিরছে?

মেহেদী হাসান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৮ | আপডেট: ৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০০

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ফাইল ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: অপরাধীদের কাছে একসময়ে আতঙ্কের নাম ছিল র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। আর সাধারণ মানুষের কাছে ছিল শেষ ভরসার প্রতীক। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সাধারণ মানুষের সেই আস্থা-ভরসার জায়গা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, গুম, ক্রসফায়ার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী এই বাহিনী। এসব অভিযোগের কারণে বাহিনীটির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে।

র‌্যাবের বিরুদ্ধে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থাকার পরও জুলাই আন্দোলনের সময় এই বাহিনীর কিছু সদস্য কর্তৃক দেশের মানুষের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে। ফলে র‌্যাবের ওপর মানুষের আতঙ্ক ও ঘৃণা আরও বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষের বড় অংশ বাহিনীটিকে ভয়ের প্রতীক হিসেবেও দেখতে শুরু করে। এমনকি মানবাধিকার সংগঠনগুলোও সমালোচনা করে র‌্যাবের কার্যক্রমের। আর এসব কারণে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে জনরোষে পড়ে র‌্যাব। ফলে এই বাহিনীর পোশাকও পরিবর্তনেরও দাবি ওঠে। তবে গত একবছরে র‌্যাব কি জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে পেরেছে?

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগের মত বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে র‌্যাবকে বেরিয়ে আসতে হবে। অপরাধ দমনে র‌্যাব নিঃসন্দেহে দক্ষ। তবে এটা অপরাধ দমনেই ব্যবহার করতে হবে। একসময়ে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য এতটাই ছিল যে, রাজধানী ঢাকায় সন্ধ্যার পর বের হতে ভয় পেত সাধারণ মানুষ। কিন্তু র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর অপরাধীরা গর্তে চলে যায়। ফলে স্বস্তি পায় সাধারণ মানুষ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় রাজনৈতিক ছোঁয়ায় বিতর্কিত হতে থাকে র‌্যাবের কতিপয় কর্মকাণ্ড। এসব আঁকড়ে ধরে না থাকলে র‌্যাব ফের মানুষের ভালোবাসার বাহিনীতে পরিণত হবে। তবে গত একবছরে র‌্যাব বিতর্ক থেকে নিজেদের গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে বলে অভিমত তাদের।

এদিকে র‌্যাব অপরাধ দমনে এখনো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। জুলাই আন্দোলনের পর এখন পর্যন্ত র‌্যাব কর্তৃক দেশে বিচারবহির্ভূত কোনো ক্রসফায়ারের মতো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি সাধারণ মানুষের পাশে থেকেই জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে তৎপর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে সংস্থাটি। বাহিনীটি তাদের নীতিগত সংস্কার, প্রশিক্ষণ উন্নয়ন ও কার্যপদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে বলে জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে র‌্যাবের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত ও নিষেধাজ্ঞার বাড়তি চাপ নিয়ে বাহিনীটি নতুন করে গ্রহণযোগ্যতা তৈরিরও চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আস্থা ফেরাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহি। কিন্তু র‌্যাবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর তদন্ত ও শাস্তির প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। অভ্যন্তরীণ তদন্তের ফলাফল খুব কম ক্ষেত্রেই জনসমক্ষে আসে। তবে জনবিশ্বাস ফেরাতে হলে অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোতে স্পষ্ট জবাব ও দায় নির্ধারণ জরুরি।

এ বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। র‌্যাব নিয়ে এখন আর মানুষের ভেতরে নেতিবাচক কোনো মনোভাব নাই। কারণ, র‌্যাব আস্থা ফিরিয়ে না আনলে মানুষ এখনো তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও অভিযোগ নিয়ে র‌্যাবের কাছে আসতো না। র‌্যাবের প্রতি তাদের বিশ্বাস ও ভরসা আছে বলেই সাধারণ মানুষ তাদের সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে ছুটে আসে। আর গত একবছরে র‌্যাবের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা নেতিবাচক কোনো কিছুই নাই। কাজেই কিছু সদস্যের কারণে র‌্যাব নিয়ে সমালোচনা তৈরি হলেও গত একবছরে র‌্যাব নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে, মানুষের মাছে আস্থা অর্জন করতে পেরেছে।’

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই বাহিনীর ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে, যেটা আগে ছিল না। এখন কেউ কোনো অপরাধে জড়িয়ে গেলে তার বিরুদ্ধে বাহিনী থেকে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গত নভেম্বরে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে ৬৫ লাখ টাকা ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে পুলিশ ও র‌্যাবের কয়েকজনের সম্পক্ততার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় তদন্ত করে পুলিশ ও র‌্যাবের সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তখন অপরাধে জরিত দুই পুলিশ সদস্যকে থানার মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয় এবং র‌্যাবের তিন সদস্যদের বিরুদ্ধে বাহিনী থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কাজেই বাহিনীর লোক হয়ে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নাই।’

‘ব্যাবের বিরুদ্ধে অপপ্রচারও হয়’- এমনটা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভিউয়ের জন্য কিছু গণমাধ্যম র‌্যাবের বিষয়ে ভুল তথ্য উপস্থাপন করে থাকে। কারণ, নেগেটিভ সংবাদ মানুষ পড়ে বেশি। ফলে র‌্যাবের বিষয়ে মানুষের কাছে ভুল তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমরা সঠিক তথ্য গণমাধ্যমের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। সবাই সঠিক তথ্য দিয়ে বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ প্রকাশ করে, তবে র‌্যাবের ওপর মানুষের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে না বলে আশা করছি।’

অপরদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে র‌্যাবকে প্রথমে অতীতের বিতর্কিত ঘটনাগুলোর স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়- এই বার্তাটি শুধু কথায় নয়, বাস্তবে প্রমাণ করতে হবে। র‌্যাব যদি সত্যিই আস্থা ফিরিয়ে আনতে চায়, তবে প্রতিটি অভিযানে আইনি প্রক্রিয়ার পূর্ণ অনুসরণ, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

সারাবাংলা/এমএইচ/পিটিএম