উত্তরাঞ্চল থেকে ফিরে: ফারহানা ইসলাম (ছদ্ম নাম)। বাড়ি রংপুর। ছয় বছর ধরে পরীক্ষা দিয়েই যাচ্ছেন, কিন্তু চাকরি হচ্ছে না। চাকরির বয়সও তার প্রায় শেষ। যদিও ৩০ বছর সময়সীমা যখন ছিল তখন একবার শেষ হয়। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসামী ৩২ বছর করা হলে তিনি আরও দুই বছরের জন্য সুযোগ পান। সেই সুযোগের শেষ পরীক্ষা এবারের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ। সে কারণেই তিনি ঝুঁকি নিচ্ছেন। এরই মধ্যে তিনি ডিভাইস পার্টির সঙ্গে চুক্তিও করে ফেলেছেন।
সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে ফারহানা বলেন, ‘১৫ লাখ টাকায় চুক্তি হয়েছে। তবে চাকরি হলে আরও পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী, ডিভাইস ব্যবহার করে পরীক্ষা দেব। ডিভাইসের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর বলে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু আমিই না, আরও অনেকে ওই গ্রুপের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। পরীক্ষার আগে তিন লাখ টাকা দিতে হয়েছে। বাকি টাকা পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে দিতে হবে।’
লালমনিরহাটের লাবনী আক্তার (ছদ্ম নাম) অন্য আরেকটি ডিভাইস গ্রুপের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে যেহেতু চাকরি হয়নি, তাই এবার প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে ঝুঁকি নিচ্ছি। তাতে পরিবারের অনেকে সায় না দিলেও বাবার অনুমতি নিয়ে চাকরির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। এতে ২০ লাখ টাকা দিতে হবে। আমার পরিচিত আরও অন্তত ২০ জনের মতো এরকম ডিভাইস পার্টির সঙ্গে চুক্তি করেছেন।’ ধরা পড়লে কী হবে সেই চিন্তা কি করেছেন? এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘ঝুঁকি তো নিতেই হয়। না নিলে তো আর চাকরির মুখ দেখতে পারব না।’
একইরকম চুক্তি করেছেন নীলফামারীর তৌহিদ হোসেনও (ছদ্ম নাম)। যদিও তার চুক্তিটি স্ত্রীর জন্য। ঢাকার একটি ডিভাইস পার্টির সঙ্গে তার পাকাপোক্ত আলোচনা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, ডিভাইস দিয়ে কেন্দ্রে পাঠাবে। এরপর প্রশ্নের উত্তর পাঠাবে। তিনিও ২০ লাখ টাকায় চুক্তি করেছেন। এজন্য অগ্রিম ব্যাংক চেকও দেওয়া হয়েছে চক্রটিকে। একইভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন ঝালকাঠির তাবাসসুম ঝুমাও (ছদ্ম নাম)। তিনি ঢাকায় থাকেন। আর মোহাম্মদপুরের একটি বাসায় যান ডিভাইসে পরীক্ষার প্রশিক্ষণ নিতে। তাকেও ২০ লাখ টাকা দিতে হবে যদি চাকরি মেলে।
ফারহানা, লাবনী, তৌহিদ ও ঝুমাদের মতো আরও অনেকের সঙ্গে ডিভাইস পার্টির চুক্তির বিষয়ে কথা হয়েছে। যে করেই হোক তাদের একটি চাকরি চাই। আর প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় চাকরি পাওয়া একটি অন্যতম সুযোগ। কারণ হিসেবে তারা বলেন, একসঙ্গে এত নিয়োগ আর কোনো ডিপার্টমেন্টে হচ্ছে না।ভা
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে,দুই ধাপ মিলিয়ে মোট ১৪ হাজার ৩৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৮০টি। সেই হিসাবে গড়ে প্রতিটি পদের বিপরীতে লড়াই করবেন প্রায় ৭৫ জন চাকরিপ্রার্থী। অধিদফতরের তথ্যমতে, প্রথম ধাপে (রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ) ১০ হাজার ২১৯টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ৯২৯টি। দ্বিতীয় ধাপে (ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ) ৪ হাজার ১৬৬টি পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৫১টি।
সবকিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) বিকেলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে (তিন পার্বত্য জেলা ব্যতীত)। আর এবারের নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেবে সরকার। এর আগের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে এলাকায় রটে যেত ওমুক এমপি, তমুক মন্ত্রীর পিএস টাকা নিয়ে চাকরি দিচ্ছেন। সেজন্য চাকরি প্রার্থী বা তাদের স্বজনরা এমপি-মন্ত্রীদের পেছনে ধর্না দিতেন। গত দেড় বছর ধরে অন্তর্বর্তী সরকার থাকায় সেই সুযোগ নেই। আর সেজন্যই চাকরি প্রার্থীরা ডিভাইস পার্টির দিকে ঝুঁকছেন বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।
এদিকে প্রতিবারের মতো এবারও কয়েকটি প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নাম করে প্রার্থী বা তাদের স্বজনদের সঙ্গে চুক্তি করছে প্রতারক চক্রগুলো। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে তারা। চুক্তি করলেই মিলবে চাকরি, না হলে থাকতে হবে বেকার- দেওয়া হচ্ছে এমন প্রতিশ্রুতি। আর কোনো উপায় না দেখে প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন অনেকে। আবার অনেকে এর আগে এসব চুক্তির মাধ্যমে টাকা দিয়ে চাকরি পাননি; এমনকি টাকাও ফেরত পাননি- এমন অভিযোগের ছড়াছড়িও রয়েছে। তারপরও চাকরি পেতে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন প্রার্থীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানী ড. মো. তৌহিদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সমাজটা এখনো দুর্নীতির মানসিকতা নিয়েই এগিয়ে চলছে। এই সরকারের আমলে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও তা নগন্য। ডিসি-এসপি নিয়োগ ও বদলি হয়েছে বিনা পয়সায়, যা অতীতে শোনা যায়নি। প্রাথমিকে এবার কোনো এমপি বা মন্ত্রীর নামে টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। সেজন্য হয়তো সাইবার অপরাধের মাধ্যমে হাত বাড়িয়েছে অনেকে। এটিও শক্ত হাতে দমন করা উচিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর।’
ডিভাইস পার্টির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন শক্ত হাতে দমন করা হবে। এ ব্যাপারে প্রার্থীদের জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের অবশ্যই পরীক্ষা শুরু হওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে কেন্দ্রে আসন গ্রহণ করতে হবে। পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রের সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরপর কোনো প্রার্থীকে আর ঢুকতে দেওয়া হবে না।’
তিনি আরও বলেন, “কেন্দ্রে প্রবেশের সময় নারী ও পুরুষ প্রার্থীদের আলাদাভাবে তল্লাশি করা হবে। প্রয়োজনে হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহার করা হবে। ব্লুটুথ বা কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস শনাক্ত করতে পরীক্ষার্থীদের উভয়কান উন্মুক্ত রাখতে হবে। কানে কোনো ‘স্পাইক ইয়ারফোন’ আছে কি না- প্রয়োজনে তা টর্চলাইট দিয়ে চেক করা হবে। পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল ফোন, ক্যালকুলেটর, স্মার্ট ওয়াচ, যেকোনো ধরনের ঘড়ি, ভ্যানিটি ব্যাগ, পার্স বা কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস আনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।”
মহাপরিচালক বলেন, ‘এসব পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক বহিষ্কারসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রার্থীদের একটি ওএমআর শিট দেওয়া হবে, যা কালো বলপয়েন্ট কলম দিয়ে পূরণ করতে হবে। পেনসিল ব্যবহার করলে উত্তরপত্র বাতিল হবে। পরীক্ষা শেষে প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র দুটোই পরিদর্শকের কাছে জমা দিতে হবে। প্রশ্নপত্র সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যাবে না।’
এসব বিষয়ে রংপুর জেলার পুলিশ সুপার মো. মারুফাত হুসাইন সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা উপলক্ষ্যে জেলার গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কাজ করছে। স্পেসিফিক তথ্য পেলে আমরা আরও জোড়ালোভাবে কাজ করব। পরীক্ষার দিন কঠোর অবস্থানে থাকবে পুলিশ। এ বিষয়ে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
জানা গেছে, সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে প্রতিটি কেন্দ্রে ১৪৪ ধারা জারি থাকবে। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি পরীক্ষা পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করবে। এ ছাড়া, কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কারও মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। ভুয়া পরীক্ষার্থী বা অসদুপায় অবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়া হবে।