ঢাকা: দেশের সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের ফলে সরকারি সিকিউরিটিজ (ট্রেজারি বিল ও বন্ড) বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ছে। ফলে বাজেটঘাটতি মেটাতে সরকার এখন আর আগের মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল থাকছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে ‘টাকা ছাপিয়ে’ ঋণ দেওয়ার প্রবণতা থেকে সরে আসার পথে হাঁটছে। যাকে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের মঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সরকারকে সরাসরি ঋণ দেয় (যা ‘ডিভলভমেন্ট’ নামে পরিচিত), তখন বাজারে নতুন টাকর প্রবাহ বাড়ে। এই ‘উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অর্থ’ সরাসরি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। এই পথ বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন বাজারভিত্তিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণে জোর দিয়েছে সরকার। এতে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের ঝুঁকি কমছে এবং মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুনে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। ঋণের এই স্থিতি ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা ও ২০২৩ সালে ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা।
অপরদিকে সরকারি সিকিউরিটিজে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অংশীদারত্ব নাটকীয়ভাবে কমছে। ২০২৩ সালের জুনে সরকারি সিকিউরিটিজে বাংলাদেশ ব্যাংকের অংশীদারত্ব ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা, যা ছিল তখনকার মোট সিকিউরিটিজের ২৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুনে এটি কমে হয় ৮৪ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা, যা মোট সিকিউরিটিজের ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে কমে ৭১ হাজার ৬১২ কোটি টাকায় নামে, যা মোট সিকিউরিটিজের ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র দুই বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিনিয়োগের অংশ ২৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমে ১০ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে। আগে নেওয়া ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং নতুন করে সরাসরি ঋণ না নেওয়ার কারণেই এই পরিবর্তন এসেছে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
এদিকে ২০২৫ সালের জুনে সরকারি ঋণের প্রায় ৬৮ দশমিক ৮৭ শতাংশের জোগানদাতা ছিল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে প্রাইমারি ডিলার ব্যাংকগুলোর অংশ ৩৯ দশমিক ২২ শতাংশ। অন্য ব্যাংকগুলোর হিস্যা ২৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
অন্যদিকে ব্যাংকগুলো যখন তাদের তহবিলের বড় অংশ সরকারি সিকিউরিটিজের মতো ‘নিরাপদ’ খাতে বিনিয়োগ করে, তখন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। ফলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে।
নথিপত্র অনুযায়ী, সরকারি সিকিউরিটিজে একসময় মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অংশগ্রহণ করত। এ ছাড়া, অন্য কিছু খাতের বিনিয়োগ ছিল। তবে ধীরে ধীরে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সাধারণ বিমা কোম্পানি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ কোম্পানি এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রবাসীরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি সিকিউরিটিজে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ২ দশমিক ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। প্রভিডেন্ট ফান্ড/ট্রাস্টের অংশ বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যা এক বছর আগে ছিল ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ব্যক্তিগত বিনিয়োগ দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। সাধারণ বিমা কোম্পানির বিনিয়োগ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে জীবনবিমা খাত সরকারি বন্ড থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এই খাতের বিনিয়োগ ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশে নেমেছে। একইসাথে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো কম। এটি দশমিক ১৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দশমিক ১৫ শতাংশ হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসন খান বলেন, ‘আর্থিক খাত মানে শুধু ব্যাংক না। স্টক মার্কেট বড় হচ্ছে। বিনিয়োগের ধরণ বদলে যাচ্ছে। আর টাকা ছাপিয়ে সহায়তা করা হয় না। সামনে ব্যাংক নির্ভরতা কমবে।’