ঢাকা: শীতের শেষে বসন্তের হালকা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল থেকে টিএসসি হয়ে দোয়েল চত্বর; সবখানেই সেই পরিচিত ফাগুনের আমেজ। কিন্তু নেই শুধু সেই চিরচেনা ধুলোবালি মেশানো বইয়ের চিরচেনা ঘ্রাণ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল প্রান্তর আজ খাঁ খাঁ করছে। যেখানে থাকার কথা ছিল শত শত স্টল আর হাজারো পাঠকের পদচারণা, সেখানে আজ কেবল নিস্তব্ধতা। যেখানে, প্রতিবছর পহেলা ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন হয় প্রাণের মেলা বইমেলা। তখন থেকেই শুরু হয় বাঙালির দ্বিতীয় উৎসবের মাস। কিন্তু এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। নেই বাঁশ-কাঠের ঠুকঠাক শব্দ, নেই রঙের তুলিতে স্টল সাজানোর ব্যস্ততা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে প্রাণের এই মেলা এবার কিছুটা পিছিয়ে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে শুরু হতে যাচ্ছে। তাই ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ পহেলা ফেব্রুয়ারি হলেও, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যেন এক দীর্ঘশ্বাসে অপেক্ষার প্রহর গুনছে।
লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের বিষণ্নতা
বইমেলা কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি লেখক ও প্রকাশকদের মিলনমেলা। অনেক নবীন লেখক সারা বছর অপেক্ষা করেন এই মাসটির জন্য। প্রকাশকরা তাদের সারা বছরের পুঁজি বিনিয়োগ করেন বইমেলার নতুন বইয়ের ওপর। অন্যদিকে পাঠকদের বইমেলা মানেই তো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ আর ব্যাগ ভর্তি নতুন বই নিয়ে বাড়ি ফেরা। তাই ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনটি থেকেই বইমেলার শূন্যতা হৃদয়ে অনুভব করছেন পাঠকরা।
এনজিওতে কর্মরত শাহিনা সান্তনুর সঙ্গে কথা হলো টিএসসি চত্বরে। তিনি বলেন, ‘একুশের প্রথম দিন। এই দিন মানেই বইমেলার কোলাহল। সেই কোলাহল ছাড়া আমাদের বাঙালির ফেব্রুয়ারি যেন এক অলঙ্কারহীন উৎসব। আমরা চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় আছি এই মেলার জন্য। যেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মুখরিত হবে নতুন বইয়ের ঘ্রাণে।’

বইমেলা। ফাইল ছবি
ক্যালেন্ডারে ফেব্রুয়ারি, অপেক্ষায় একুশে: দেরিতে হলেও বইয়ের ঘ্রাণে মাতবে শহর
পহেলা ফেব্রুয়ারি মানেই যেখানে বাংলা একাডেমি আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে দীর্ঘ লাইন থাকত, সেখানে আজ কেবল প্রস্তুতির ব্যস্ততা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের কারণে এবারের মেলা কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু হচ্ছে এবারের মেলা।
নির্বাচনের পর নতুন উদ্দীপনা
এবারের ফেব্রুয়ারি মাসটি বাঙালির জন্য দ্বিগুণ উত্তেজনার। একদিকে ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট, অন্যদিকে তার ঠিক আট দিন পরেই শুরু হতে যাচ্ছে প্রাণের বইমেলা। নির্বাচনের কারণে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যস্ততা মাথায় রেখেই মেলা পিছিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত। যদিও প্রকাশকদের একটি অংশ রোজা ও ঈদের পর মেলা করার আবেদন করেছিলেন, কিন্তু বাংলা একাডেমি তাদের সিদ্ধান্ত অটল রেখেছে। ফেব্রুয়ারি মানেই একুশের চেতনা, আর সেই চেতনা মিশে আছে বইমেলাতেই। তাই একুশের ফেব্রুয়ারির আগের দিন থেকেই শুরু হবে বইমেলা ২০২৬। যাতে একুশের চেতনাকে বাঙালি হৃদয়ের ধারণ করে শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসে পৌঁছায় বইমেলা প্রাঙ্গণে।
প্রকাশকদের জন্য এবার স্টল ভাড়া আগের তুলনায় কিছুটা কম
বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিরতার কারণে প্রকাশকরা আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় ছিলেন। তাদের এই উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকদের সুবিধার্থে স্টল ভাড়া ২৫ শতাংশ কমানোর যুগান্তকারী নির্দেশনা দিয়েছেন।

বইমেলা। ফাইল ছবি
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির পরিচালক মো. আবুল বাশার ফিরোজ শেখ বলেন, ‘পবিত্র রমজান এবং বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের কারণে আগের ভাড়ায় স্টল নেওয়া প্রকাশকদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমরা ভাড়া কমানোর আবেদন জানিয়েছিলাম এবং তা গৃহীত হওয়ায় আমরা কৃতজ্ঞ।’
বাংলা অ্যাকাডেমির প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা
মেলার প্রস্তুতি এখন পুরোদমে চলছে। ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক প্রকাশনা ও প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে আবেদন করেছে। বাংলা অ্যাকাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম সারাবাংলাকে বলেন, ‘মেলা ২০ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু হচ্ছে। প্রকাশকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং এ ব্যাপারে আমরা দ্রুতই বিস্তারিত জানাব। মেলা পেছানোর কোনো নতুন সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত নেই।’
ফেব্রুয়ারির ২০ দিনের প্রতীক্ষা
১ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি এই ২০ দিনের শূন্যতা পাঠকদের হৃদয়ে কিছুটা বিষণ্নতা ছড়ালেও, ভাড়া কমানো এবং মেলার চূড়ান্ত তারিখ নিশ্চিত হওয়াতে লেখক-পাঠক-প্রকাশক মহলে স্বস্তি ফিরেছে। এবারের মেলা কেবল বইয়ের মেলা নয়, বরং নির্বাচনের আমেজ কাটিয়ে উঠার পর একটি নতুন জাতীয় মিলনোৎসবে পরিণত হবে।

বইমেলা। ফাইল ছবি
বইমেলা মানেই তো বাঙালির নিজস্ব ঠিকানা। দেরি হলেও এবারের মেলা নিয়ে প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে। ধুলোমাখা পথ, প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ আর ২৫ শতাংশ ছাড়ে স্টল পাওয়ার স্বস্তি নিয়ে প্রকাশকরা সাজাচ্ছেন তাদের সম্ভার। ২০ ফেব্রুয়ারি যখন গেট খুলবে, তখন সেই ২০ দিনের দীর্ঘ প্রতীক্ষা সুদে-আসলে পুষিয়ে নেবেন বইপ্রেমীরা।