ঢাকা: ২০০৯ থেকে ২০২৬। সময়ের ব্যবধান ১৭ বছর। এই সময়ে হয়ে গেছে প্রশ্নবিদ্ধ তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে দীর্ঘ দেড়যুগ পর এবার সেই প্রশ্ন থেকে বেরিয়ে আসতে পুরো দেশ মেতেছে ভোট উৎসবে। যেততেন উৎসব নয়, গণতন্ত্র উত্তরণের সোনালী সোপান ধরা হচ্ছে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে। কেউ কেউ অবশ্য বলছে, নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের প্রত্যাশায় জনগণ আজ দেবে তাদের চূড়ান্ত রায়। আর এটি হবে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার প্রথম ধাপ।
এর আগের তিনটি নির্বাচনের মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ‘বিনা ভোট’ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘রাতের ভোট’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। আর সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচন ‘আমি-ডামির’ ভোট হিসেবে পরিচিত। কারণ, এই নির্বাচনগুলোতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও তাদের সহযোগী দলগুলো অংশ নিত। কিন্তু, বাংলাদেশের বৃহত্তম দল বিএনপি নির্বাচনগুলো বয়কট করে। এমনকি বিএনপির জোটমিত্র দলগুলোও নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। ফলে নির্বাচনগুলো দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ২৪-এর গণআন্দোলনে পরাজিত শক্তি আওয়ামী লীগ ‘গণহত্যা’র দায়ে এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারিয়েছে। ফলে দেশের অন্যান্য দলগুলোকে নিয়ে হচ্ছে বহুল কাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দীর্ঘ ১৭ বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে জনগণ নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের প্রত্যাশায় তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ, সেইসঙ্গে রয়েছে টানটান উত্তেজনা। নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য, সবধরনের শঙ্কা ও সহিংসতা এড়িয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া। এ লক্ষ্যে দেশব্যাপী মাঠে আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাত লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন সদস্য। এবারের নির্বাচনে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৯৯টি আসনে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। একসঙ্গে সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুমোদনের গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে বিরাজ করছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ও উদ্দীপনা।
ইসির তথ্যানুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে অংশ নেওয়া ৫০টি দলের মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দুই হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এক হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। প্রার্থীদের মধ্যে নারী ৮৩ জন, দলীয় ৬৩ ও স্বতন্ত্র ২০ জন। বিএনপির নারী প্রার্থী ১০ জন। জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ইসলামপন্থী দলগুলোর কোনো নারী প্রার্থী নেই।
নির্বাচনে রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৫৯৮ জন। এ ছাড়া, প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন সাত লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে থাকবেন সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর ৯ লাখ ১৯ হাজার ২৮০ সদস্য। পাশাপাশি দায়িত্বে থাকবেন প্রায় দুই হাজার ১০০ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট।
এদিকে, প্রথমবারের মতো এই নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসী, নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কারাবন্দিরা ভোট দিচ্ছেন। নির্বাচনে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ’ ব্যবহার হচ্ছে। অ্যাপটি কেবল নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করবেন। কোনো ভোটকেন্দ্রে বা আশপাশে সহিংসতা বা গোলযোগ হলে অ্যাপের মাধ্যমে দ্রুত সংশ্লিষ্ট বাহিনী, রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে বার্তা পৌঁছে যাবে।
জানা গেছে, ভোটের দিন নির্বাচনের অগ্রগতি প্রতিবেদন আগের মতোই দুই ঘণ্টা পর পর দেবে নির্বাচন কমিশন। কেন্দ্র থেকেও ভোটের ফলাফল জানানো হবে। এরপর রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় ও পরে নির্বাচন কমিশনে ফলাফল দেওয়া হবে। সংসদ ও গণভোটের ফলাফল একসঙ্গে দেওয়া হবে। কেন্দ্রেও ভোট গণনা একসঙ্গে হবে। ফলাফলও হবে একসঙ্গে।