Wednesday 15 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সড়কের নামফলক ও জাদুঘরের স্মৃতিচিহ্নে সীমাবদ্ধ ভাষা সংগ্রামীদের নাম

এস এম মাসুদুর রহমান তরুন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:৩২ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৪১

সড়কের নামফলক ও জাদুঘরের স্মৃতিচিহ্নে সীমাবদ্ধ ভাষাসংগ্রামীদের নাম। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ফরিদপুর: ১৯৫২ থেকে ২০২৬, সময়ের হিসাবে গড়িয়েছে ৭৪ বছর। আর এই সময়ে ’৫২-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব যেন দিন দিন কমতে শুরু করেছে। ভাষা শহিদদের নামে কোথাও কোথাও দুয়েকটি রাস্তার নামকরণ, অথবা জাদুঘরে কিছু ছবিতে ধরা পড়ে আছে স্মৃতিচিহ্ন। এমনকি যাদের জীবনের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই ভাষারও বেহাল দশা।

ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পেরিয়ে গেলেও ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকদের নেই কোনো সঠিক তালিকা। ঢাকার রাজপথে মিছিলে থাকা ভাষা সৈনিকসহ জেলার সক্রিয় ভাষা সৈনিকদের স্মৃতিকথা আজ ম্লানের পথে। এই অঞ্চলের ভাষা সৈনিকদের গল্প জানে না নতুন প্রজন্ম। ঢাকায় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের বাইরেও ভাষা আন্দোলন বিভিন্ন জেলায় দানা বেঁধে ওঠে। সেইসব জেলার ভাষা সৈনিকদের বীরত্বগাথাও হারাতে বসেছে। ভাষা সৈনিক হিসেবে শহরের দু’চারটি রাস্তার নামকরণ আর ফরিদপুর মিউজিয়ামে ছবির ফ্রেমে আটকে আছে তাদের স্মৃতিচিহ্ন।

বিজ্ঞাপন

এ জেলায় ভাষা আন্দোলনে বেশ কয়েকজনের অবদানের কথা শোনা যায়। এদের মধ্যে ফরিদপুর শহরের সন্তান ডা. মোহাম্মদ জাহেদ। তিনি ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তিনি তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্র। ১৯৫২-৫৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রসংসদের সহ-সভাপতি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্যও ছিলেন তিনি।

১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেলের এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলীর আরেক সন্তান ডা. ননী গোপাল সাহা। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন প্রাঙ্গণে আমতলায় ছাত্র-জনতার সভায় যোগ দেন তিনি এবং পরে মিছিলে শামিল হন। সেদিনের সেই মিছিলেই পুলিশের গুলিবর্ষণ হয়।

এছাড়াও, ’৫২-এর সেই ভাষা আন্দোলনে শহিদ বরকত’র মৃত্যু চাক্ষুস করেছেন অ্যাডভোকেট এ কে এম শামসুল বারী (মিয়া মোহন)। মিছিলে পুলিশের গুলিতে বরকত পেটে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় যখন ছটফট করছিলেন, তখন মিয়া মোহন নিজে আহত হওয়া সত্ত্বেও কাঁধে করে বরকতকে মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়ার আন্দোলন করে গেছেন জেলার এই কৃতি সন্তানরা।

ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকদের মধ্যে ডা. মোহম্মদ জাহেদ, অধ্যাপক আবদুল গফুর, ডা. ননী গোপাল সাহা, একেএম সামসুল বারী (মিয়া মোহন), মহিউদ্দিন আহমেদ, ইমাম উদ্দিন আহম্মেদ, রওশন জামাল খান, এজহারুল হক সুর্য্য মিয়া, মহীউদ্দিন আহমেদ, সাংবাদিক লিয়াকত হোসেন, সামসুদ্দিন মোল্যা, মনোয়ার হোসেন, এস.এম. নুরুন্নবীদের নাম শোনা যায়।

ভাষা সৈনিক সাংবাদিক লিয়াকত হোসেনের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন রনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘মার্তৃভাষা বাংলার দাবিতে যারা যেখানে অবদান রেখেছিল তাদের স্মরণে করতে চায় ফরিদপুরবাসী। এজন্য জেলার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পাশে স্থানীয় ভাষা সৈনিকদের স্মৃতিফলক নির্মাণ, একুশের বইমেলায় একটি স্টলে ভাষা সৈনিকদের স্মৃতিগাথা তুলে ধরা যেতে পারে।’ নানা উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তাদের অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে ধরার দাবি সচেতন মহলসহ নতুন প্রজন্মের।

গণমাধ্যমকর্মী ও নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক পান্না বালা সারাবাংলাকে বলেন, ‘মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে ফরিদপুরেও সক্রিয়ভাবে বেশ কয়েকজন নানা উপায়ে সংবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নেমেছিল। ইমান উদ্দিন আহমেদ, সাংবাদিক লিয়াকত হোসেন, সামসুদ্দিন মোল্যা রাজেন্দ্র কলেজ থেকে একত্রিত হয়ে জেলা স্কুল ও হাইস্কুলে গিয়ে ক্যাম্পিং করেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাদের নামে কয়েকটি স্থানে কেবলমাত্র সড়কের নাম করা হলেও ভাষা সৈনিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডা. ননী গোপাল সাহা ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র থাকা অবস্থায় ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু ঝিলটুলীতে তার বাসার সামনে রাস্তার নাম ফলকটি এখন আর দেখা যাচ্ছে না। যে জাতি তার বীর সন্তানকে মনে রাখে না, সে জাতিতে বীর জন্মায় না।’

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্ররাও। তারা মিছিল নিয়ে জেলা স্কুল হয়ে শহরের থানা রোড ও জেলখানার সামনে গেলে পুলিশের লাঠিচার্জের শিকার হন। এতে আহত হয়ে দুয়েকজনের গ্রেফতারের ইতিহাসও শোনা যায়।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের শিক্ষার্থী আবরাব নাদিম ইতু সারাবাংলাকে বলেন, ‘ফরিদপুরে সরকারি বা বেসরকারিভাবে ভাষা সৈনিকদের নাম ঠিকানা বা তাদের কোনো স্মৃতিচিহ্ন কেউ কোনদিন তুলে ধরেনি। তাই তাদের অবদানের কথা আমাদের প্রজন্ম জানেই না। যাদের অবদানে আমরা মাতৃভাষায় কথা বলি, তাদের স্মরণ করতে চাই।’ তাদের জন্য স্মৃতিফলক ও বই মেলাতে আলাদা স্টলসহ যুগউপযোগী উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের সক্রিয় কর্মী জেবা তাহসিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভাষা সৈনিকদের নামে শুধু সড়কের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্কুল কলেজে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও তাদের নিয়ে আলোচনা, চিত্রাংকন, কুইজ ও রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ এবং হোস্টেলগুলোর নাম করণ করা যেতে পারে। তাহলেই তাদের অবদান ও স্মৃতি নতুন প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকবে।’

ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মফিজ ইমাম মিলন জানান, নব্বয়ের দশকে ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (ইসলামি ফাউন্ডেশন) ফরিদপুর জেলা শাখার উদ্যোগে জেলার কয়েকজন ভাষা সৈনিককে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।’ ফরিদপুরে ভাষা সংগ্রামীদের সম্মান জানানোর ওটাই একমাত্র উদাহরণ বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর