ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুদ্ধের এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই দেশের জ্বালানি স্টেশনগুলোতে তেল না মেলার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাতে রাজধানীর তেল পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেকে তেল না পেয়ে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর চলে গেছেন। বাড়তি দাম নেওয়ার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে এই দাম শিগগিরই বাড়ানো হবে বলে পাম্পগুলো থেকে এখনই গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অফিযোগ করেছেন ক্রেতারা।
দেশে আদৌ কি জ্বালানি তেলের সংকট রয়েছে এই মুহূর্তে? নাকি ব্যবসায়ীরা এ অযুহাতে বাড়তি দাম আদায়ের চেষ্টা করছেন? এ নিয়ে জানার চেষ্টা করেছে সারাবাংলা ডটনেট।
দেশে তেল মজুদ নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, গত ৩ মার্চের হিসেব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুদ আছে।
বিপিসি চেয়ারম্যান জানান, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের মজুতের মধ্যে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রল ১৫ দিন, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিন এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের সমপরিমাণ রয়েছে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে জ্বালানি তেলের বিকল্প আমদানি বাজার খোঁজার বিষয়েও ভাবা হচ্ছে। তবে বর্তমানে যে পরিমাণ মজুদ রয়েছে, তাতে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনো সংকট নেই। তবে যদি অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
বিপিসির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিদ্যমান মজুত অনুযায়ী কিছু জ্বালানির মজুদ ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে, যার একটি থেকে তেল খালাসের কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি জাহাজ সমুদ্র পথে রয়েছে যা কয়েকদিনের মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের দাবি, ইরান ইস্যুতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ সাময়কি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে ইরান খুব শিগগির ইউরোপ-আমেরিকা ও ইসরায়েলের জাহাজ ব্যতিত অন্যকোনো তেলবাহী জাহাজ আটকাবে না বলে আশা করছেন জ্বালানি বোদ্ধারা। সেক্ষেত্রে তেল নিয়ে দেশে কোনো সংকট থাকবে বলেও আশঙ্কা নেই।
তাহলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাম্প স্টেশনগুলোতে হঠাৎ করে তেল মিলছে না কেন? জানতে চাইলে বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, এ রকম কোনো নির্দেশনা কাউকে দেওয়া হয়নি। যারা তেল দিচ্ছে না তারা সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছাতেই দিচ্ছে না। আমরা এসব বিষয় খতিয়ে দেখব। তেলের সংকট থাকলে সবার আগে সরকার সব পক্ষকে নিয়ে কথা বলবে। বিকল্প পন্থা বের করবে সরকার। কাজেই তার আগেই তেল নাই বলে দাম বাড়াবে তা মেনে নেওয়া হবে না। সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজধানীর শেওড়াপাড়া তেল পাম্পে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। তবে তেলের মজুদ সংকট দেখা দিয়েছে। নিয়মিত যে তেল আসে আর যা বিক্রি হয় তা স্বাভাবিক গতিতেই চলতো। কিন্তু হঠাৎ করে বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) থেকে যারাই তেল নিচ্ছে তারাই টাঙ্কি লোড করে নিচ্ছে। আর সকল গ্রাহক একেবারেই হুমরি খেয়ে তেল কিনতে আসছে। ফলে সরবরাহ করা মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার গাড়ি আসছে তখন আর সমস্যা হচ্ছে না। এখন কেউ যদি বাসায় নিয়ে মজুদ করে রাখে তাহলে সংকট তীব্র আকার ধারণ করবে।
অকটেন কি?
অকটেন হলো আটটি কার্বন পরমাণু বিশিষ্ট একটি সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন বা অ্যালকেন। যা মূলত পেট্রোল ইঞ্জিনের উচ্চ-মানের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি গাড়ির ইঞ্জিনের নকিং বা অস্বাভাবিক শব্দ কমায় এবং কার্যক্ষমতা বাড়ায়। এটি একটি বর্ণহীন তরল পদার্থ, যা পেট্রোলিয়াম শোধন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়। কার, মোটরসাইকেল বা বাইকে জ্বালানি হিসেবে অকটেন ব্যবহৃত হয়।
এটি পেট্রোলের তুলনায় কিছুটা হালকা, কম কার্বনযুক্ত এবং উচ্চ সংকোচন ক্ষমতা সম্পন্ন, যা ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা বজায় রাখে।
অকটেন কি আমদানি করা হয়?
দেশীয় চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ অকটেন দেশেই উৎপাদিত হয়। বাকিটা বিভিন্ন কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি বিপিসি বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। কাজেই অকটেন বিদেশ থেকে আমদানি করতে অসুবিধা হলেও একেবারেই মজুদে ঘাটতি পড়বে না। দেশের উৎপাদন কিছুটা বাড়িয়ে দিলে অকটেনের চাহিদা পুরণ সম্ভব বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের প্রধান স্থানগুলো-
বাংলাদেশে মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে অপরিশোধিত তেল শোধনের সময় উপজাত হিসেবে এবং সিলেটের বিভিন্ন গ্যাস ফিল্ডের কনডেনসেট থেকে অকটেন উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া, কিছু বেসরকারি কোম্পানিও কনডেনসেট ব্যবহার করে অকটেন উৎপাদন করছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (চট্টগ্রাম): এটি দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল শোধনাগার, যেখানে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত খনিজ তেল শোধন করে অকটেন ও পেট্রোল তৈরি হয়।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডস: সিলেটের বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্রে পাওয়া কনডেনসেটকে রিফাইন করে বা ‘অকটেন বুস্টার’ কেমিক্যাল ব্যবহার করে অকটেন তৈরি করা হয়।
বেসরকারি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট: দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে দক্ষিণ অঞ্চলে (যেমন পারটেক্স পেট্রো), কনডেনসেট থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে।
তাছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন স্থানীয় উৎপাদন ছাড়াও বিপুল পরিমাণ অকটেন বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে।