Wednesday 18 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ঈদযাত্রায় বাসে বাড়তি ভাড়া, অনিয়মই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে

উজ্জল জিসান স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১৮ মার্চ ২০২৬ ১৪:০২ | আপডেট: ১৮ মার্চ ২০২৬ ১৪:৩৪

রাজধানীর গাবতলীতে একটি বাসের টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন যাত্রীরা। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: ঈদ এলেই বাস কর্তৃপক্ষ ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ঈদযাত্রায় ঘরমুখো যাত্রীদের থেকে ইচ্ছামতো ভাড়া নেওয়ার প্রতিযোাগিতায় মেতে ওঠেন তারা। নিয়ম না মেনে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে দূরপাল্লার বাসগুলো। ভাড়া বাড়িয়ে কখনও দিগুণ বা তার চেয়েও বেশি টাকা আদায় করে পরিবহণগুলো। ফলে প্রতিবার ঈদ এলেই যে বাসে চলাচল করতে বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে- এই অনিয়মই বর্তমানে একটি নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বুধবার (১৮ মার্চ) রাজধানীর মহাখালী, সায়েদাবাদ ও গাবতলি বাস টার্মিনাল ঘুরে যাত্রীদের কাছ থেকে এসব অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সময় বিভিন্ন বাসের টিকিট কাউন্টার থেকেও অভিযোগ পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

বাসের টিকিট কাউন্টারগুলোর অভিযোগ, এবারের সমস্যা ভিন্ন। এরমধ্যে বড় সমস্যা হলো- নির্ধারিত সময়ে তেল না পাওয়া ও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর কাঙ্খিত তেল না পাওয়া। এছাড়া এখন মানুষ বাড়ির দিকে ছুটছে। ফলে ঢাকায় আসার মতো কোনো যাত্রী মিলছে না। এসব কারণে বাসগুলোকে যাত্রীশূন্য অবস্থায় ঢাকায় ফিরতে হয়।

উত্তরবঙ্গের অন্যতম পরিবহণ এস আর ট্রাভেলস। পরিবহণটির কল্যানপুর ডিপোর ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম সারাবাংলাকে বলেন, ঈদ ছাড়া কোম্পানি কোনো দিন একটি টাকাও বেশি ভাড়া নেয়নি। তবে ঈদের সময় ডাবল ভাড়া নেওয়া হয়। কারণ বাসগুলো খালি আসে। তাই দুই দিকের ভাড়া যাত্রীর কাছ থেকে নেওয়া হয়। যাত্রীরা জেনেই দেয়। এতে যাত্রীদের অভিযোগ থাকে না।

ম্যানেজার আরও বলেন, যাত্রীদের অভিযোগ তখন আসে যখন বেশি ভাড়া আদায় করার পরও ঠিকমতো সার্ভিস পান না। আবার ভাড়া বেশি নিয়ে কোম্পানি উধাও এরকম বেলায় যাত্রীদের অভিযোগ জোড়ালো হয়। এছাড়া যাত্রীরা কখনো প্রতারিত নাহলে তারা অভিযোগ করেন না। ঈদের সময় ভালো সার্ভিস পেলেই যাত্রীরা বেশি ভাড়া দিলেও অভিযোগ করেন না।

এক প্রশ্নের জবাবে এস আর ট্রাভেলসের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সরকার নিয়মের কথা সব সময় বলবে। সরকার আমাদের খালি আসা গাড়িটার খরচ বহন করতা তাহলে আমরা নির্দিষ্ট ভাড়াতেই গাড়ি চালাতাম। কিন্তু সরকার তো তা করছে না। এখানে দেখার বিষয় দুই ট্রিপের ভাড়া নিচ্ছি নাকি তার চেয়েও বেশি নিচ্ছি। দিগুণের চেয়ে বেশি নিলে তখন সেটা  বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে।

গাবতলী-কল্যানপুর বাস কাউন্টারগুলো ঘুরে জানা যায়, ব্রান্ডের যেকোনো বাসই দিগুণ ভাড়া নিচ্ছে। এই কাউন্টারগুলো থেকে উত্তরাঞ্চল ও উতর পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াত করে বাসগুলো।

কল্যানপুরে শ্যামলী কাউন্টারে দেখা যায়, সেখানে নতুন করে কোনো টিকিট দেওয়া হচ্ছে না। যাত্রীরা আগেই যে টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন তারাই কাউন্টারে উপস্থিত হয়েছেন। তারা বাসের অপেক্ষা করছেন। তবে সকাল ৯টার যাত্রীরা সাড়ে ১০টাতেও বাস পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

পরিবারসহ রংপুর যাবেন জাভেদ ইসলাম। তিনি অপেক্ষা করছেন বাস কখন আসবে। তিনি বলেন, এমনিতেই দিগুণ ভাড়া নিয়েছেন এরপর নিদিষ্ট সময়ে বাস আসছে না। পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বলে জানান তিনি। তবে বাস কাউন্টার থেকে বলা হয়েছে, রাস্তায় যানজটে আটকে আছে বাস তাই একটু অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

গাবতলী বাস টার্মিনালে ভোক্তা অধিকার, পুলিশ, র‌্যাব ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে নজরদারি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে অনেক পরিবহণই লাগাম ছাড়া ভাড়া আদায়ের চেষ্টা থেকে সরে আসছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাত্রীরা যায়। এই টার্মিনালে তদারকি বেশি থাকায় এখানে বেশি ভাড়া আদায় অনেকটা লাগামের মধ্যেই থাকে। এই টার্মিনাল থেকে আগাম টিকিট না দেওয়ায় সবাই প্রতি এক ঘণ্টা পরপর বাস ছাড়ে টিকিটও সেই সময় অনুযায়ী নিয়ে থাকে। যার ফলে এখানে বাড়তি ভাড়া আদায় তেমন একটা দেখা যায় না। আর পরিবহণ সংখ্যা অনেক থাকায় একটা পছন্দ না হলে আরেকটিতে টিকিট কেটে চলে যায়। ফলে বেশিরভাগই নির্দিষ্ট ভাড়া নেয়। আবার কেউ কেউ ৫০ বা ১০০ টাকা বেশি নিয়ে থাকে। তবে বেশি নেওয়ার সংখ্যা খুবই কম।

ইমাদ পরিবহণ চলাচল করে পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট ও শরীয়তপুর রুটে। তারা একটি টাকাও বেশি ভাড়া নিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ সেলিম।

ইমাদ পরিবহণের যাত্রী ইমরান আলী সকাল ১০টার গাড়িতে যাচ্ছেন সাতক্ষীরা। তিনি বলেন, যা ভাড়া তাই নিয়েছে। কত ভাড়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, নন এসিতে ৮০০ টাকা ভাড়া নিয়েছে। আগেও ৮০০ টাকা ভাড়া ছিল। ঈদে ভাড়া বাড়ায়নি। তবে নন ব্রান্ডের অনেক বাসই যাত্রীদের কাছ থেকে দুইগুন তিনগুন ভাড়া আদায় করছে বলেও অভিযোগ আছে। এরমধ্যে মাদারীপুর ফরিদপুর, বরিশাল, বরগুনা ও শরীয়তপুর রুটে চলাচলকারী বাস রয়েছে।

মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে এনা পরিবহণের বাসে সিলেট যাচ্ছে মাসুদুল হাসান নামে এক যাত্রী। তিনি বলেন, দুই হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছেন নন এসি বাসে। এসির ভাড়া আরও বেশি। আগে এই ভাড়া ছিল এক হাজার টাকা। কিছুই করার নেই। ফোন দিয়ে বুক করেছিলাম সিট। এসে টাকা দিলাম দুই হাজার। বেশি কেন জানতে চাইলে কাউন্টার থেকে জানিয়েছে, ফেরার সময় বাসগুলো খালি ফিরছে তাই দুই দিকের ভাড়া একজনের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে। এসব অভিযোগ কাকে দিলে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে সেটাই জানি না।

নেত্রকোনা যাচ্ছেন রবিউল ইসলাম নামে একজন ব্যাংকার। তিনি বলেন, ভাটি বাংলা এক্সপ্রেস ও শাহজালাল পরিবহণের বাসের আগে ভাড়া ছিল ৭০০ টাকার মতো। আজ সেই বাসে টিকিটের দাম নিলো ১৫০০ টাকা। এর চেয়ে কিছু নিম্নমানের গাড়ি আছে যেগুলোর ভাড়াও নিচ্ছে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকার মতো। অভিযোগ করলে টিকিটটাই বাতিল করে দেবে। তখন বাড়ি যাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে। সেজন্য কাউকে অভিযোগ করি না। আর অভিযোগ করেও লাভ হয় না। যা ক্ষতি হয় যাত্রীরই ক্ষতি হয়।

এসব বিষয় জানতে ঢাকা জেলা বাস মালিক পরিবহণ সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বাতেন সারাবাংলাকে বলেন, ব্রান্ডের বাসগুলো ক্ষতি পোষানোর জন্য যাত্রীর সাথে মিউচুয়াল করে ভাড়া একটু বেশি নেয়। তবে তারা সার্ভিস ভালো দেয়। আর নন ব্রান্ডের বাসগুলো তেমন বেশি ভাড়া আদায় করার অভিযোগ পাইনি। সবাই আনন্দের সাথে গ্রামে যাচ্ছে আবার ঢাকায় ফিরে আসবে। এই বাসগুলোই সাধারণ মানুষকে সেবা দিচ্ছে। সবাই ঈদ করবে অথচ বাস শ্রমিকরা রাস্তায় দিন কাটাবে। এমনও হবে ঈদের দিনেও বাস চালাতে হচ্ছে। কাজেই ভাড়া বেশি আদায় করার কোনো অভিযোগ আমার কাছে নেই।

এবারের ঈদ যাত্রায় ভাড়া আদায় করার অভিযোগ করেছেন অনেক যাত্রী। আবার ভাড়া বেশি নিয়েও বাসের দেখা মিলছে না-সব বিষয় কি জানেন এবং জানলেও কি ব্যবস্থা নিয়েছেন? জানতে চাইলে ঢাকা আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, পরিবহণ মালিকরা মূলত যাত্রীসেবা দিয়ে থাকে। যাত্রীরা কে কতটা সেবা পেলে তার ওপর নির্ভর করে ভাড়া কত দিয়েছে। বেশি দিয়েছে নাকি কম দিয়েছে। ভাড়া কম দিয়ে সেবা ভালো না পেলেও অভিযোগ করবে যাত্রী। আবার বেশি ভাড়া দিয়ে ভালো সেবা পেলে যাত্রীরা খুশি থাকেন।

তিনি আরও বলেন, ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ তেমন না পেলেও কোনো কোনো কোম্পানি যে নেয় না তা অস্বীকার করবো না। আমাদের টিম মাঠে কাজ করছে, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে যাতে কেউ বেশি ভাড়া নিতে না পারে।

ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে কিনা এবং নিলেও তাদের কি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি মিডিয়া) তালেবুর রহমান বলেন, কমিশনারের নেতৃত্বে প্রতিদিনই বিভিন্ন বাস টার্মিনালে তদারকি করা হচ্ছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগগুলো ঘটনাস্থলেই সমাধান করা হচ্ছে। অনেকের বাড়তি ভাড়া ফেরত দেওয়া হয়েছে। ঈদযাত্রা এখন পর্যন্ত স্বস্তির তা বোঝা যাচ্ছে। তেমন কোনো যানজট বা ভোগান্তি চোখে পড়ছে না।

বিজ্ঞাপন

আরো

উজ্জল জিসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর