ঢাকা: ‘ছুটিতে দেশে আইছিলাম পাঁচ মাসের জন্য। ভাবছিলাম পাসপোর্ট অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নামের সামান্য ভুলটা ঠিক কইরা যামু। কিন্তু তিন মাস ধইরা নির্বাচন অফিসে ঘুইরাও কোনো কাজ অয় নাই। ছুটির মেয়াদ শেষ, অহন চাকরি বাঁচানোই কঠিন হইয়া পড়ছে’— চোখের জল মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন সৌদি প্রবাসী আব্দুল্লাহ মিয়া।
আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগে সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় আব্দুল্লাহ মিয়ার। তিনি বলেন, ‘আমি সাত সাত বছর অইল সৌদি আরবে থাকি। আমার পাসপোর্ট’র মেয়াদ শেষ। আমি দেশে আসছি পাঁচ মাসের ছুটি নিয়া। পাসপোর্টে আমার নাম আব্দুল্লাহ মিয়া, কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে শুধু আব্দুল্লাহ। এহুন এনআইডিতে মিয়া না থাকার কারণে আমি আমার পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়াইতে পারতাছি না। এতে আমার বিদ্যাশ যাওয়া অনিশ্চিত হইয়্যা পড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নামের সঙ্গে মিয়া শব্দটি যোগ করার জন্য আমার জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে দুই মাস ঘুরছি। কিন্তু কেউ ঠিক কইরা দেই নাই। হেইজন্য ঢাকার নির্বাচন কমিশনে আসছি। সারাদিন ঘুইরা বিকেল পর্যন্তও কোনো কাজ অয় নাই। এই কাজ কবেইবা শেষ অইব?’
এনআইডি নিয়ে কথা হয় মালয়েশিয়া প্রবাসী মোহাম্মদ জামানের সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘দেশে এসে ভেবেছিলাম এনআইডিটা সংশোধন করব। কিন্তু এখন দেখছি আমার ভিসার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। আমি জানতে পারলাম আমার কাজটা স্থানীয় উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে আটকে আছে। দুই মাসের ছুটি নিয়ে এসেছে। এরই মধ্যে ভিসা নবায়নের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। অথচ, এনআইডি হাতে না পাওয়ায় পাসপোর্ট সংশোধন বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টসংক্রান্ত কাজও সম্পন্ন করতে পারছি না।’
তবে এনআইডি ভোগান্তি নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিলেন আমেরিকা প্রবাসী হুদা। এ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি ২০ বছর ধরে আমেরিকায় থাকি। এই ২০ বছরে মাঝে একবার দেশে এসে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেও নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রটি করতে পারিনি। পরে এক দালাল এক লাখ টাকার বিনিময়ে কাজটা করে দিতে রাজি হয়। কিন্তু আমি কাজটা না করেই বিদেশে চলে যাই। পরে যখন আমেরিকার লস এঞ্জেলস-এ নির্বাচন কমিশন এনআইডি সেবা চালু করে, তখন আমি সেখান থেকে লাখ টাকা ছাড়াই আমার এনআইডিটি পেয়ে যাই।’
মূলত, প্রবাসে বিশ্বমানের বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তিতে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নিবন্ধন সহজতর করা হলেও, দেশে ফিরেই নজিরবিহীন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নাকাল হচ্ছেন রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। এনআইডিতে নাম, বয়স বা বানানের সামান্য ভুল সংশোধনের ফাইল মাসের পর মাস নির্বাচন অফিসে আটকে থাকছে।
ফলে দেশে আসা প্রবাসীদের ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া, চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হওয়া এবং পাসপোর্ট নবায়ন থমকে যাওয়ার মতো ঘটনা দৈনন্দিন চিত্রে পরিণত হয়েছে। এ বৈষম্যমূলক ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে অবশেষে প্রবাসীদের জন্য এনআইডি সংশোধনের প্রচলিত নিয়মকানুন ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) শিথিলের চিন্তাভাবনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এনআইডি অনুবিভাগের সর্বশেষ (১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ) তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের ১৪টি দেশে ২৪টি স্টেশনের মাধ্যমে বসবাসরত ভোটারদের নিবন্ধন ও এনআইডি প্রদান কার্যক্রমের আওতায় এ পর্যন্ত ৬২ হাজার ৫৮৯ জন প্রবাসী জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন।
সংস্থাটির সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, মোট আবেদনকারীদের মধ্যে ৬২ হাজার ৫৮৯ জনের বায়োমেট্রিক গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এদের মধ্যে তদন্ত শেষে ৫৪ হাজার ৭২৭ জন প্রবাসীর আবেদন অনুমোদন করা হলেও প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্যগত ত্রুটির কারণে ২৬ হাজার ৬৩৩ জনের আবেদন বাতিল করা হয়েছে। অর্থাৎ, জমা পড়া মোট আবেদনের বিপরীতে এনআইডি বাতিলের হার প্রায় ২৬ শতাংশ। আর এই বাতিল বা ঝুলন্ত আবেদনের সুরাহা করতে গিয়েই দেশে ফিরে অন্তহীন হয়রানির মুখে পড়ছেন প্রবাসীরা।
দেশভিত্তিক আবেদনের চিত্র
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বাধিক সংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রে থেকে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে (আবুধাবি ও দুবাই) সর্বোচ্চ ২৪ হাজার ৮৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। এর পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আবেদন এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে (নিউইয়র্ক, মিয়ামি, ওয়াশিংটন ডিসি ও লস অ্যাঞ্জেলেস), যার পরিমাণ ১৮ হাজার ৬৬৫টি। এ ছাড়া সৌদি আরবে ছয় হাজার ৯৭৮টি, ইতালিতে নয় হাজার ৪৯০টি এবং মালদ্বীপে ৩২৯টি আবেদন জমা পড়ে।
অন্যান্য দেশের মধ্যে কুয়েতে ৫ হাজার ৯৩০টি, কাতারে ৫ হাজার ৯৩০টি, কানাডায় ৩ হাজার ৮১২টি, মালয়েশিয়ায় ২ হাজার ৫৪ টি, ওমানে ২ হাজার ৫৯৫টি, অস্ট্রেলিয়ায় ১ হাজার ৪৬৪ টি, জাপানে ৩৬৬টি, মালদ্বীপে ৩২৯টি ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৪১টি আবেদন জমা পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
ভোগান্তি কমাতে শিথিল হচ্ছে নিয়ম
ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসীদের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ভোগ কমাতে বিদ্যমান নিয়মমালায় বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিচ্ছে এনআইডি অনুবিভাগ। বর্তমানে এনআইডি সংশোধনের জটিলতা বিচারে ‘ক’, ‘ক-১’, ‘খ’, ‘খ-১’, ‘গ’ ও ‘ঘ’-এই ছয়টি ক্যাটাগরিতে আবেদন বিভাগ করা হয়। এর মধ্যে সাধারণ বানান ভুল বা করণিক সংশোধনের দায়িত্ব উপজেলা ও জেলা কর্মকর্তাদের হাতে থাকলেও জন্মতারিখ ও বয়স সংশোধনের মতো বড় বিষয়ের অনুমোদন দিতে পারেন কেবল এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি)। ফলে অধিকাংশ প্রবাসীর ফাইল গ ও ঘ ক্যাটাগরিতে পড়ে বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
প্রবাসীদের সুবিধা দিতে নিম্নলিখিত বিষয়ে শিথিলতা আনার চেষ্টা চলছে
বিদেশি কাগজপত্রের গ্রহণযোগ্যতা: বয়সের বা অন্যান্য তথ্য সংশোধনে প্রবাসীদের পাসপোর্টের পাশাপাশি বিএমইটি (BMET) কার্ড, বিদেশে চাকরির আইডি, রেসিডেন্স পারমিট বা আকামা, ভিসা পেপারস, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি বিদেশি নথি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হবে। এসব ক্ষেত্রে অনলাইন ভেরিফিকেশন সুবিধা থাকা কাগজপত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
উত্তরাধিকার সনদ: জন্মতারিখের যৌক্তিকতা প্রমাণে আবেদনকারীর ভাই-বোন বা বাবা-মায়ের বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্য ঠিক আছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য ওয়ারিশ বা পারিবারিক উত্তরাধিকার সনদ বাধ্যতামূলকভাবে দেখা হবে।
ভুয়া আবেদন প্রতিরোধে কড়া নজরদারি: ভুয়া বা প্রতারণামূলক আবেদন রোধে কোনো অ-প্রবাসী ব্যক্তি যাতে প্রবাসী পরিচয়ের অপব্যবহার করতে না পারেন, সেজন্য তাদের পাসপোর্ট ধরে বিদেশে গমন ও দেশে ফেরার সময়কাল (ইমিগ্রেশন ডাটা) নিবিড়ভাবে যাচাই করা হবে। পরবর্তী সময়ে বিএমইটি ও ইমিগ্রেশন ডাটাবেজের সঙ্গে এনআইডি সার্ভারের সমন্বয় ঘটানোরও রূপরেখা রয়েছে।
এনআইডি বিষয়ে সিইসির বক্তব্য
এনআইডি সেবা সহজীকরণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে ভোগান্তি কমাতে ও তথ্য জালিয়াতি বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন ২৭ আগস্ট নির্বাচন ভবনে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জালিয়াতি আমরা শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
এনআইডি জালিয়াতি প্রতিরোধ প্রসঙ্গে সিইসি আরও যোগ করেন, ‘জালিয়াতি তো করেই। এটা শুধু নির্বাচন কমিশন দেখলে হবে না, সারা দেশের সব ডিপার্টমেন্টের বিষয় আছে। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি এগুলো শেষ করে দেওয়ার জন্য।’ কমিশন মনে করছে, নিয়মকানুন শিথিলের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়ালে আসল প্রবাসীদের ভোগান্তি কমবে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে ভুয়া এনআইডি সংশোধনের প্রবণতাও বন্ধ হবে।
নীতিমালার অগ্রগতি ও ইসির উদ্যোগ
প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের সার্বিক জটিলতা নিরসনে ইসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র কেবল একটি কার্ড নয়; এর সঙ্গে আইনি, অর্থনৈতিক, উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার জড়িত। ফলে আইন ও বিধি মেনে প্রবাসীদের প্রতিটি কেস পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
তিনি জানান, প্রবাসীদের এনআইডিসংক্রান্ত যাবতীয় জটিলতা ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে শিগগিরই এক বিশেষ ওয়ার্কশপ আয়োজন পরিকল্পনা চলছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে, যার মাধ্যমে এসওপি শিথিলের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা চূড়ান্ত হবে।
উল্লেখ্য, ২০০৯-১০ এর পর থেকে প্রবাসীদের এনআইডি দেওয়ার কথা উঠলেও ২০১৯ সালে মালয়েশিয়ায় পরীক্ষামূলক চালুর মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হয়। মালয়েশিয়ায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর শুরু হওয়া এই প্রবাসী এনআইডি সেবা ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসে নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ইতালি, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মালদ্বীপ, ওমান ও দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবাসী এনআইডি সেবা চালু রয়েছে।
জানা গেছে, খুব শিগগিরই বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, সুইডেন, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডেও এটি বিস্তৃত করা হবে। সিইসির ঘোষিত জালিয়াতিবিরোধী কঠোর অবস্থান এবং নতুন শিথিল নীতিমালা একসঙ্গে কার্যকর হলে দেশে এসে প্রবাসীদের মাসের পর মাস ঘোরার ভোগান্তি অনেকাংশে ঘুচবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।