Thursday 01 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

অবহেলা-ভোগান্তির শেষ কোথায়? / ধূসর-একা ও বিষন্ন ফ্রেমে বন্দি প্রবীণ জীবন

নাজনীন লাকী, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১ অক্টোবর ২০২৬ ২০:০২

প্রবীণ ব্যক্তি। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা লিলি খানম। স্বামীর জমানো টাকায় চার সন্তানকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। আজ তিনি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও মেরুদণ্ডের সমস্যায় জর্জরিত। সন্তানরা যার যার ব্যস্ততায় মগ্ন। লিলি খানমের বুকফাটা আকুতি, ‘টাকার অভাবের চেয়েও বড় কষ্ট হলো, সন্ধ্যায় খাবার টেবিলে বসে আমার সাথে দুটো কথা বলার মতো কেউ নেই। সবাইকে মানুষ করে আজ আমি বড্ড একা।’

ধানমন্ডির আভিজাত্য ঘেরা ফ্ল্যাটে গৃহপরিচারিকার ওপর ভরসা করে দিন কাটে মনোয়ারা বেগমের। কারণ, তার দুই সন্তানই প্রবাসী। চরম একাকীত্ব তাকে ধুঁকে ধুঁকে মারছে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘ঈদের দিনেও যখন খাঁ খাঁ ঘরে একা বসে থাকি, তখন মনে হয় এর চেয়ে কোনো প্রবীণ আশ্রমে থাকা অনেক ভালো ছিল। সেখানে অন্তত সমবয়সী কারও সাথে দুটো কথা তো বলা যেত।’

বিজ্ঞাপন

যেসব প্রবীণ একসময় শক্ত হাতে পরিবারের হাল ধরেছিলেন, সন্তানদের সোনালি ভবিষ্যতের জন্য নিজের সব সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছিলেন, জীবনের শেষ ভাগে এসে সেই প্রিয় ঘরেই তিনি যেন ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় ও আড়ালের মানুষ হয়ে যান।

১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো দিনটি। এ বছরের দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোর পুনর্চিন্তা’। প্রতিবছরের মতো এবারও আলোচনা সভা, সেমিনার ও নানা কর্মসূচিতে প্রবীণদের সুরক্ষায় নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। তবে এই আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এসে সাধারণ পরিবারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় এক ধূসর, একা ও বিষণ্ণ চিত্র।

বর্তমানে দেশে ৬০ বছরের বেশি প্রবীণ জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ, যা মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০২৬ সাল শেষে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ১ কোটি ৬৮ লাখে। তবে জনসংখ্যায় প্রবীণের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়লেও তাদের জন্য নেই বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা ও পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা। পর্যাপ্ত বয়স্ক ভাতার অভাব এবং আলাদা মন্ত্রণালয়ের অনুপস্থিতিতে পদে পদে অবহেলা ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দেশের প্রবীণরা।

আবাসন ও চিকিৎসাসেবা সংকট চরমে

দেশে প্রবীণদের জন্য সরকারি আবাসন ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। সমাজসেবা অধিদফতরের উদ্যোগে আট বিভাগে শিশুদের পাশাপাশি প্রবীণদের আবাসনের জন্য ‘শান্তি নিবাস’ প্রকল্প নেওয়া হলেও তা এখনো পুরোদমে যাত্রা শুরু করতে পারেনি। সমাজসেবা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান ৮৫টি সরকারি শিশু পরিবারের প্রতিটিতে ১০ জন করে প্রবীণ রাখার সুযোগ থাকলেও অনেকেই সেখানে থাকতে আগ্রহী নন। আপাতত আটটি বিভাগে প্রবীণ আবাসন শুরুর চেষ্টা চলছে।

সেই সঙ্গে প্রবীণদের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা (জেরিয়াট্রিক মেডিসিন) দেশে অত্যন্ত সীমিত। রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে একটি জেরিয়াট্রিক ডে কেয়ার ইউনিট এবং দ্রুত সেবার জন্য ‘ফল ক্লিনিক’ চালু থাকলেও ঢাকা মেডিকেলসহ অন্যান্য বড় সরকারি হাসপাতালে প্রবীণদের সাধারণ রোগীদের মতোই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।

সামাজিক নিরাপত্তা ও বয়স্ক ভাতার ভোগান্তি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী, বর্তমানে একজন প্রবীণ মাসে ৭০০ টাকা বয়স্ক ভাতা পান (৯০ বছরের ঊর্ধ্বে একহাজার টাকা)। তবে এই ভাতা পেতেও পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি। প্রতারণা ঠেকাতে সরকার ভাতাভোগীর নিজস্ব মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর নিয়ম করলেও নম্বর পরিবর্তন ও প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে অনেক প্রবীণ অর্থ হারাচ্ছেন।

জানা গেছে, বেশ কয়েকটি প্রতারক চক্র ভাতাভোগীদের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের আরও বেশি অর্থ দেওয়া হবে এমন প্রলোভনে পিন ও কোড নম্বর সংগ্রহ করে। পরে ভাতাভোগীর অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা তারা হাতিয়ে নেয়।

আইনি সুরক্ষা বনাম সামাজিক বাস্তবতা

মা-বাবার অধিকার রক্ষায় দেশে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ বিদ্যমান। আইন অনুযায়ী সন্তানরা মা-বাবার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সঙ্গ প্রদান করতে আইনত বাধ্য। এই আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা জরিমানা বা তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এমনকি মা-বাবার অমতে সন্তানরা তাদের আলাদা রাখতে পারবে না। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল আইন প্রয়োগ করে ভালোবাসা ও পারিবারিক মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘‘আমাদের সামাজিক কাঠামো দ্রুত পাল্টাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভাঙায় প্রবীণরা তাদের প্রথাগত ভূমিকা হারাচ্ছেন। এখন অভিজ্ঞতার চেয়ে অর্থনৈতিক ‘উৎপাদনশীলতা’ দিয়ে মানুষের মূল্য মাপা হয়।” প্রবীণদের কেবল ‘অতীতের অংশ’ না ভেবে সমাজের মূল স্রোতে এবং পরিবারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে যুক্ত রাখাই তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার একমাত্র পথ বলে মনে করেন এই অধ্যাপক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল ১ অক্টোবরের আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রা, সরকারি আশ্বাস কিংবা মিষ্টি কথায় প্রবীণদের অধিকার নিশ্চিত করা যাবে না। প্রবীণদের ঘর থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে তাদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে। পারিবারিক পর্যায়ে ভালোবাসার উষ্ণতা ও মানসিক সঙ্গ দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’র সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, দীর্ঘদিন আটকে থাকা ‘প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আইন’ পাস, বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ‘প্রবীণ মন্ত্রণালয়’ গঠন এখন সময়ের দাবি।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, বার্ধক্য কোনো অপরাধ, শারীরিক আকস্মিকতা বা ব্যাধি নয়; এটি প্রকৃতির এক স্বাভাবিক, অলঙ্ঘনীয় ও অনিবার্য পরিণতি। আজ যারা নিজেদের তারুণ্য, অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা সামাজিক ক্ষমতার চূড়ায় বসে প্রবীণদের অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন, কালকের সূর্য তাদের জন্য ঠিক একইভাবে বার্ধক্যের বার্তা নিয়ে আসবে। তাই প্রবীণদের প্রতি সহমর্মিতা ও ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেওয়া কেবল কোনো করুণা বা দয়া নয়, এটি আমাদের নৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ গড়ার প্রাথমিক শর্ত।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর