ঢাকা: দেশের শিক্ষক সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, শিক্ষকতা কখনোই ‘উপায়হীন বিকল্প’ কিংবা একটি সাধারণ চাকরির মতো হতে পারে না। দেশের সবচেয়ে মেধাবী মানুষ যাতে কর্মজীবনে শিক্ষকতাকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নেন, সেভাবেই শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) ওসমানী মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাকে তিনি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে মেধা ও যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কৃত শিক্ষকদের অভিনন্দন জানান।
তিনি বলেন, সম্মানিত শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের ‘প্রয়োজন এবং প্রিয়জন’ হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে একজন সুনাগরিক হিসেবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা আরও সহজ হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারিবারিক পাঠশালার গণ্ডি পার হওয়ার পর প্রতিটি শিক্ষার্থীর সামনে শিক্ষক-শিক্ষিকারাই আদর্শ রোল মডেল। শিক্ষকরা যাতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের রোল মডেল হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতে পারেন, সে ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে সরকার।
আধুনিকায়ন হচ্ছে শিক্ষা পদ্ধতি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের এই সময়ে প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে এসে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘শিখন’ ও ‘শিক্ষণ’ পদ্ধতির কৌশল পরিবর্তন এবং শিক্ষা সিলেবাসের আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। বাস্তবতার নিরিখে সরকার নতুন সিলেবাস প্রণয়ন করেছে এবং এ বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বই হাতে পাবে।
শিক্ষার্থীরা যাতে বইবিমুখ হয়ে না ওঠে, সেজন্য শিখন ও শিক্ষণ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুখস্থ করার চেয়ে ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’- এই প্রশ্নগুলো শিক্ষার্থীদের মনে জাগিয়ে তুলতে হবে। কৌতূহল থাকলে একজন শিক্ষার্থী নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, ‘আনন্দময় শিক্ষা’ শিখন কৌশল হিসেবে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এবার প্রথমবারের মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ শিরোনামে একটি নতুন বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণিতেও এ বই দেওয়া হবে।
প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের শক্তি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞান অর্জনের সুযোগকে অবারিত করেছে। সার্টিফিকেটনির্ভর জ্ঞানের পরিবর্তে কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞান অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি শিক্ষকদের সামনেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তাই সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোর আরও আধুনিকায়ন জরুরি।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিকে শিক্ষকতার বিকল্প হিসেবে দেখতে চায় না সরকার। বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের শক্তি। এ লক্ষ্যেই ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
একজন শিক্ষক ট্যাবের মাধ্যমে ডিজিটাল লেসন প্ল্যান, প্রশ্নব্যাংক, শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষণসামগ্রী ব্যবহার করতে পারবেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণ এবং বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না কোনো শিশু
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে কোনো শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকবে না। শিক্ষাজীবনের যেকোনো পর্যায় থেকে কেউ কোনো কারণে ঝরে পড়লেও যেন তাকে বেকার থাকতে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষা খাত বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে।
তিনি বলেন, দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ২১ হাজার প্রতিষ্ঠান এবং তিন লাখের বেশি শিক্ষক বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিচ্ছেন। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার বড় অংশই বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।
শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে এখনও কিছুটা পার্থক্য রয়েছে স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহর কিংবা গ্রাম—সব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যাতে দক্ষ শিক্ষক ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে সরকারের নানা পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো—সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার।
নৈতিকতা ও চরিত্র গঠন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য
কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি কর্মসংস্থানই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়; নৈতিকতা ও চরিত্র গঠন অবশ্যই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। জ্ঞান যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে সেই জ্ঞান সমাজের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের কারণও হতে পারে।
সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও অন্যের প্রতি সম্মানকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে পরিবারের পর শিক্ষক-শিক্ষিকারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
শিক্ষকতার মর্যাদা বাড়াতে উদ্যোগ
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকতা পেশাকে সুযোগ ও সম্মানের দিক থেকে প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শিক্ষকতা পেশা কখনোই ‘উপায়হীন বিকল্প’ কিংবা সাধারণ চাকরির মতো হতে পারে না। বরং শিক্ষা-দীক্ষায় সবচেয়ে মেধাবী মানুষটি যাতে কর্মজীবনে শিক্ষকতাকে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হন, সরকার শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সেভাবেই ঢেলে সাজাচ্ছে।
‘রাষ্ট্র ও সমাজে শিক্ষকদের সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি জড়িত’—উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকলে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বাড়ে।
জাতীয় দিবসে শিক্ষকদের আমন্ত্রণ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ভবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন।
তিনি বলেন, চলতি বছর থেকেই নীতিমালার ভিত্তিতে এসব জাতীয় দিবসে আমন্ত্রিতদের তালিকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের কমপক্ষে একজন করে শিক্ষককে বাধ্যতামূলকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
কর্মরত কিংবা অবসর—যে অবস্থাতেই থাকুন, একজন শিক্ষক তার মহান পেশার কারণেই আমৃত্যু রাষ্ট্রের কাছে সম্মানীয় বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন বা অবসরভাতার জন্য কষ্ট করে অফিসে ঘোরাঘুরি না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, যথানিয়মে যথাসময়ে তাঁদের প্রাপ্য অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের শিক্ষকরা জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের শিক্ষক সমাজের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।