ঢাকা: শরতের নীল আকাশ, শিউলি ফুলের গন্ধ, কাশফুলের দোলা আর ঢাকের বাদ্যের মোহনীয় রেশ কাটিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে। পঞ্জিকার হিসাব ও ধর্মীয় বিধান মেনে বুধবার (২১ অক্টোবর) কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সম্পন্ন হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন।
বিজয়া দশমীর লগ্ন শুরু হওয়া মানেই ভক্তদের হৃদয়ে এক গভীর বিষাদের সুর বেজে ওঠা। দীর্ঘ পাঁচ দিনের আনন্দ-উল্লাস, পূজা-অর্চনা আর মায়ের সান্নিধ্যের পর দেবালয়ের কৈলাসে স্বামীর ঘরে ফেরার পালা। এ বিদায়ের ক্ষণটি ভক্তদের মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে।
আজ বিজয়া দশমীর দিন রাজধানীর ওয়াইজঘাট ও বুড়িগঙ্গার তীর ছিল লোকে লোকারণ্য। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতেই ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টার বাদ্যের তালে তালে নগরীর বিভিন্ন মন্দির ও মহল্লা থেকে শোভাযাত্রা করে প্রতিমাগুলো নদীর তীরে নিয়ে আসা হয়। শঙ্খ, খোল ও ঢাকের বাদ্যের সুরে দেবীর স্তুতি গেয়ে ভক্তরা ট্রাক বা বিশেষ বাহনে করে ঘাটে পৌঁছান। এর পর নৌকাযোগে প্রতিমাগুলো নদীর মাঝখানে নিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়।
এ সময় চারপাশের দৃশ্যপট এক আবেগঘন রূপ নেয়। ভক্তদের কারও চোখে চিকচিক করে জল, কারও ঠোঁটে বিরামহীন উচ্চারিত হয় মায়ের বন্দনা। শেষ মুহূর্তে মায়ের চরণে ফুল দিয়ে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও সব ধরনের অপশক্তি দূর করার প্রার্থনা জানান সবাই। নদী থেকে পানি তুলে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের গায়ে ছিটিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন ভক্তরা।

বিজয়া শোভাযাত্রা শেষে রাজধানীর সদরঘাট এলাকায় প্রতিমা বিসর্জন। ছবি: সারাবাংলা
এবারের উৎসবে ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় ৩২ হাজার ১৬৮টি পূজা মণ্ডপে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে শারদোৎসব। চট্টগ্রাম বন্দর নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, কর্ণফুলী নদী, ফিরিঙ্গি বাজার, কালুরঘাট ও সীতাকুণ্ডের সলিমপুর সৈকত এলাকায় হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে।
শুধু চট্টগ্রাম মহানগরীর ২৮২টি স্থানে এবং জেলার ১৫টি উপজেলার দুই হাজার ৬২টি মণ্ডপে ভক্তদের ব্যাপক সমাগম ঘটেছিল। ষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের এই মহোৎসবে মণ্ডপে মণ্ডপে ছিল উপচে পড়া ভিড়। দশমীর সকালে মন্ত্র পাঠ, দেবীর উদ্দেশে ফুল নিবেদন এবং আশীর্বাদ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ দিনের পূজা সম্পন্ন হয়।
উৎসবের শেষ দিনটিতে কারও চোখে বিদায়ের অশ্রু। আবার কারো চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। প্রতিমা বিসর্জন দেখতে আসা সুস্মিতা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘দশমীর লগ্ন শুরু হওয়া মানেই তো মন খারাপের শুরু। মা চলে যাচ্ছেন ভেবে খুব কষ্ট হচ্ছে। এই ক’টি দিন মা আমাদের মাঝে ছিলেন, তাই সময়টা দারুণ আনন্দে কেটেছে। মায়ের কাছে একটাই প্রার্থনা, তিনি যেন এ দেশ থেকে সব ধরনের অপশক্তি দূর করে দেশকে শান্তিময় করেন এবং সবাইকে ভালো রাখেন।’
রীতা সোমাদ্দার সারাবাংলাকে বলেন, ‘মায়ের বিদায়ে বুকটা ভরে উঠছে কষ্টে। কারণ, এখন আবার একটি বছর মায়ের আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’

বিজয়া শোভাযাত্রা শেষে রাজধানীর সদরঘাট এলাকায় প্রতিমা বিসর্জন। ছবি: সারাবাংলা
বুদ্ধদেব কুন্ডু সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মাকে বিদায় জানাতে এসেছি। মা আমাদের মঙ্গলের জন্য, অসুর বধ করার জন্য ধরাধামে এসেছিলেন। আমরা মায়ের কাছে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। অন্যায় ও অপরাধ দূর হয়ে আগামী দিনগুলো যেন সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়, এটাই আমাদের একান্ত প্রার্থনা।’
শাস্ত্রীয় পঞ্জিকা মতে, এবারের দেবী দুর্গার আগমন ঘটেছিল ঘোটকে বা ঘোড়ায়, যা অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের আশঙ্কার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে দেবীর গমন ঘটছে নৌকায়, যাকে শাস্ত্র মতে অত্যন্ত শুভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নৌকায় গমনের এই প্রতীক শস্যবৃদ্ধি বা সমৃদ্ধির বার্তা বয়ে আনে।
শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাঙালির সার্বজনীন উৎসব, যা সম্প্রীতি ও মিলনের মেলবন্ধন তৈরি করে। প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে দেবীকে সাময়িক বিদায় জানানো হলেও ভক্তদের হৃদয়ে ও বিশ্বাসে রয়ে যায় আগামী বছর তার পুনরাগমনের অন্তহীন প্রত্যাশা।
একটি সুন্দর, শান্তিময় ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকেই যেন বুড়িগঙ্গার জলরাশি পেরিয়ে আজকের দিনে সমাপ্তি ঘটল শারদোৎসবের। সাত পাকে ঘুরিয়ে দেবীকে বিদায় জানানোর আগে ভক্তরা যেন বলে দিচ্ছে- ‘সামনে বছর আবার এসো মা’।