Sunday 18 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জোটে মিলল না ইসলামপন্থীরা
‘ওয়ান বক্স’-এর ভোট যাচ্ছে ৩ বাক্সে

মো. মহসিন হোসেন স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:২৯ | আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ২৩:৪৯

জোটে মিলল না ইসলামপন্থীরা। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নাটকীয় সব ঘটনা ঘটছে রাজনীতিতে। এসব ঘটনার সর্বশেষ সংযোজন ১১ দলীয় ঐক্যে ভাঙন। আর এর মধ্য দিয়েই দেশের ইসলামীপন্থী দলগুলোর ‘ওয়ান বাক্স’ ভোটের টার্গেটেও ফাটল ধরল। ভোট এখন এক বাক্সে নয়, তিন বাক্সে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।

রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসলামপন্থীরা এক হতে গিয়ে তিন ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, এটা নতুন কিছু না। আরও ভাগ হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ওয়ান বক্স এখন তিন বাক্সে পরিণত হলো।

জানা গেছে, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ায় মূলত ইসলামপন্থী জনগণের ভোট ভাগ হওয়ার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জামায়াতে ইসলামী আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এক হয়ে ‘ওয়ান বক্স’ পলিসি ঘোষণা করলেও সেই পলিসি ভেঙে যায় আসন ভাগাভাগি নিয়ে।

বিজ্ঞাপন

অপরদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দু’টি অংশ ও ইসলামী ঐক্যজোটের একটি অংশ বিএনপির কাছ থেকে পাঁচটি আসন পেয়ে তারা বিএনপি জোটে রয়েছে। এখন ইসলামপন্থীদের ভোট এক বক্সের পরিবর্তে তিন বক্সে যাচ্ছে। একটি বাক্স জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০দলীয় জোটে, একটি অংশ চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, আর একটি অংশ বিএনপি জোটে যাচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে যে ১০টি দলের নির্বাচনি ঐক্য হয়েছে তার মধ্যে ইসলামী দল পাঁচটি। সেগুলো হলো- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি। এদের সঙ্গে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি(জাগপা)।

এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঘোষণা দিয়েছে, এককভাবে ২৬৮ আসনে নির্বাচন করবে। তবে অন্যকোনো ইসলামী দল যদি তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় তাহলে ৩২ আসনে তাদের সমর্থন দেবে। আর তৃতীয় ধারায় বিএনপির নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক হিসেবে নির্বাচনি সমঝোতায় যুক্ত তিনটি ইসলামি দল রয়েছে। যাদের একটি নিবন্ধিত ও দু’টি নিবন্ধনহীন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দুটি অংশ, অপরটি মাওলানা আবদুর রকিবের নেতৃত্বে ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে ইসলামপন্থীদের ভোট এক বাক্সে আনার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলো। এখন ইসলামপন্থীদের ভোট স্পষ্টত তিন বাক্সে বিভক্ত হয়ে পড়ল। এর রেশ ভোটের মাঠে কতটুকু-কীভাবে পড়ে, সেটি দেখার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুরু থেকেই আসন ভাগাভাগি নিয়ে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বী মানসিকতা ছিল। ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ৭০-৮০টি আসন। বিপরীতে জামায়াত ৪৫ আসনে ছাড় দিতে চেয়েছিল। এতে জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সন্দেহ তৈরি হয়—এটি কেবল আসনের দাবি, নাকি ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা। শেষ পর্যন্ত ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করে জামায়াত সিদ্ধান্ত নেয়, ইসলামী আন্দোলন ছাড়া ১০ দল নিয়ে এগোনোই তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক।

অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনও বিকল্প নির্বাচনি মোর্চা গঠনের চেষ্টা করে। যদিও তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। দলটির ভেতরেও ঐক্যের প্রশ্নে মতভেদ ছিল। দলটির আমিরসহ বড় অংশ জামায়াতের সঙ্গে থাকার পক্ষে থাকলেও একটি প্রভাবশালী অংশ ভেতরে-ভেতরে এর বিরোধী ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, জোট ভাঙা নিয়ে চরমোনাইর পীর রেজাউল করিম ও তার ভাই ফয়জুল করীমের মধ্যেও বিভক্তি ছিল।

ইসলামী আন্দোলনের এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত জানানোর সংবাদ সম্মেলনে দলের দুই শীর্ষস্থানীয় নেতা সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম ও সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি দলের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমদও সেখানে ছিলেন না। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘জামায়াতের নির্বাচনি ঐক্যে না থাকার কারণ হচ্ছে, আমরা নীতি ও ইনসাফের প্রশ্নে বৈষম্যের শিকার হয়েছি। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘বিভিন্ন জরিপের ফলাফল নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের সমর্থন নিয়ে জামায়াত আমির তাদের আমিরকে ইনসাল্ট করেছেন।’

এ বিষয়ে ‘১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য’র সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ওনাদের জন্য চেয়ারও খালি রেখেছি, আসনও ফাঁকা রেখেছি। এরপর আর কী করণীয় ছিল আমাদের।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, হেফাজত, জমিয়ত ও ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতার মুখে জামায়াতের জন্য ভোটের মাঠে ভ্যানগার্ডের ভূমিকা নিতে পারে মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস। কওমি মাদরাসাভিত্তিক ভোটব্যাংকে মামুনুল হকের ব্যক্তিগত প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির নেতাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদের এলডিপিকে এই মোর্চায় অন্তর্ভুক্তিকে জামায়াত বড় অর্জন হিসেবে দেখছে।

সূত্রগুলো বলছে, ইসলামি দলগুলোর মধ্যে জামায়াতের পরই ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান। সারা দেশে দলটির ভোট ও সাংগঠনিক অবস্থান রয়েছে। জামায়াতের মোর্চা থেকে তাদের আলাদা হয়ে যাওয়া দুই পক্ষের জন্যই ক্ষতি।

অন্যদিকে এবারের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় রয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ তিনটি ইসলামি দল। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে চারটি আসনে বিএনপি ছাড় দিয়েছে। এ ছাড়া, নিবন্ধনহীন বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও আবদুর রকিবের নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটের একটি অংশও এই সমঝোতার অংশ। নিবন্ধনহীন জমিয়তের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাছকে বিএনপি যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তবে আবদুর রকিবের দল কোনো আসন পায়নি।

প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর ইসলামী ঐক্যজোটও শিগগিরই বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শোকবইয়ে সই করতে গিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ ও নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আমাদের কাজ করতে হলে ইসলামের কিছু বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার বা ঘোষণা লাগবে। সেটি হলে আমরা বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে রাজি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজনীতি সচেতন এক ব্যক্তি সারাবাংলাকে বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে এই বিভক্তি নির্বাচনের রাজনীতিতে সব পক্ষের জন্য একটা ধাক্কা হিসেবে কাজ করবে। আমি বলব, এটা তাদের অপরিণামদর্শিতা। এতে জামায়াত যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হলো, তেমনি ইসলামী আন্দোলন সংসদে যেতে পারবে কি না সন্দেহ। কারণ, অতীতে তারা কোনো আসন পায়নি।’

ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের সহকারী প্রচার সেক্রেটারি আবদুস সাত্তার সুমন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা অপেক্ষায় আছি। এখনো সময় আছে। আশা করি সবাই এক হয়ে নির্বাচনে অংশ নেব।’

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) মহাসচিব আবদুল মতিন সাউদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘জামায়াত-চরমোনাই জোট ভাঙার কারণে বিএনপির বিজয় সুনিশ্চিত হয়েছে। ভোট ওয়ান বক্স থেকে তিন বাক্স হওয়ায় ইসলামপন্থীরা দুর্বল হয়ে গেল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভোলা-১ আসনে আমাদের দলীয় চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ নির্বাচনে আছেন। সেখানে এখন জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী থাকায় আমাদের বিজয় সহজ হবে।’

সারাবাংলা/এমএমএইচ/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

মো. মহসিন হোসেন - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর