Sunday 25 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আওয়ামী পুনর্বাসনের ‘কূটচাল’ নিয়ে ভোটের মাঠে রাঙ্গা!

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:৫৩ | আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০০:১৩

জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক এমপি মসিউর রহমান রাঙ্গা। ফাইল ছবি

লালমনিরহাট থেকে ফিরে: মসিউর রহমান রাঙ্গা। এক আলোচিত চরিত্র। অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২০ পর্যন্ত পরিবহণ খাত থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুট করেছেন রাঙ্গা, শাজাহান খান ও এনায়েত উল্যাহ সিন্ডিকেট। চাঁদাবাজির টাকায় দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ। তবে দেড় দশক ধরে দেশের সড়ক পরিবহণ খাত দাপিয়ে বেড়ানো রাঙ্গার সাম্রাজ্য এখন আর নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের পাশাপাশি জাতীয় পার্টির বহিষ্কৃত মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা আত্মগোপনে চলে যান।

জাতীয় পার্টির সাবেক এই সংসদ সদস্য ও পরিবহণ মালিক সমিতির সভাপতি মসিউর রহমান রাঙ্গা ছাত্র-জনতা হত্যাযজ্ঞের একাধিক মামলায় আসামি হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। গ্রেফতার এড়াতে দেশের ভেতরে বারবার স্থান পরিবর্তন করছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। তবে হঠাৎ করেই আত্মগোপন থেকে ফিরে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তিনি। আর প্রার্থী হয়েই আগের মতো আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে উঠেপড়ে লেগেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের আগের হঠাৎ করেই একটি ভিডিও বার্তা দেন রাঙ্গা। সেই বার্তা ছিল মূলত আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। ওই বার্তায় জিএম কাদেরের কাছে ক্ষমা চাওয়ার পর তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হয়। এরপর রাঙ্গাকে লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম) আসনে লাঙ্গল মার্কার মনোনয়ন দেয় জাতীয় পার্টি। কিন্তু নির্বাচনের মাঠে নেমেই আগের চেহারায় হাজির তিনি। সম্প্রতি লালমনিরহাট-১ আসনের (হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম) বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে আওয়ামী পুনর্বাসনে রাঙ্গার নির্বাচনি কূটচাল সম্পর্কে নানান তথ্য পাওয়া গেছে।

রাঙ্গার নির্বাচনি ক্যাম্পে আওয়ামী লীগ কর্মীদের যাতায়াত

এলাকাবাসীর অনেকেই এই প্রতিবেদককে বলেন, হাতীবান্ধা উপজেলার ১০ নম্বর ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের কাশিমবাজারে রাঙ্গার পৈত্রিক বাড়ি। সেখান থেকে নির্বাচনি ক্যাম্প পরিচালনা করে ভোটের মাঠে কাজ করছেন রাঙ্গা। বাজারের পাশে এই বাড়িতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা অবাধে যাতায়াত করছেন। এখান থেকে পাড়া-মহল্লায় ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তিনি নির্বাচিত হলে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি এলাকায় নিরাপদে থাকবেন। আর নির্বাচিত না হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বড় বিপদ হতে পারে বলেও ভয় দেখাচ্ছেন।

প্রতিদিন গরু জবাই করে খাওয়ানো হচ্ছে

নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের ডেকে এনে গরু জবাই করে মাংস-ভাত খাওয়ানো হচ্ছে। এখানে অনেকে এলেও বেশিরভাগ লোকই তার এই দাওয়াত এড়িয়ে যাচ্ছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাঙ্গা সারাজীবন রংপুরের গঙ্গাচড়ার উন্নয়ন করেছেন। নিজের এলাকার কোনো উন্নয়ন করেননি। আর এখন বিপদে পড়ে এলাকায় এসে ভোটে দাঁড়িয়েছেন। ভোট কি এতই সহজ! ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের সাধারণ ভোটাররা জানান, দিনের বেলায় তিনি খুব একটা বের হন না। ২২ জানুয়ারির আগে রাতের বেলায় জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন সভাপতি, সেক্রেটারিসহ নেতাকর্মীদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন।

আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক

গত ১৯ জানুয়ারি রাতে গোতামারী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ার‌ম্যান কাশেম মিয়ার উত্তর গোতামারীর বাড়িতে গোপন বৈঠক করেন রাঙ্গা। সেখানে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠক থেকে জানা যায়, এই মুহূর্তে গণভোটে ‘না’ প্রচার এবং আওয়ামী ও জাতীয় পার্টির সব ভোট মসিউর রহমান রাঙ্গাকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি হয়।

আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতির সঙ্গে গোপন বৈঠক

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি লিয়াকত হোসেন বাচ্চুর সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন মসিউর রহমান রাঙ্গা। ২০ জানুয়ারি রাতে হাতীবান্ধার বাড়াইপাড়া এলাকায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে গোপনসূত্রে জানা গেছে। বাচ্চু তাকে বলেছেন যে, সামনে আরও পরিষ্কার হবে যে, আওয়ামী লীগের ভোট কাকে দেওয়ার নির্দেশনা আসবে।

উপজেলা সাধারণ সম্পাদক সোহাগের সঙ্গে বৈঠক

সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মোতাহার হোসেনের বড় ছেলে হাতীবান্ধা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান সোহাগের সঙ্গে রংপুরে বৈঠক করেছেন মসিউর রহমান রাঙ্গা। ২১ জানুয়ারি রাতের ওই বৈঠকে ছিলেন পাটগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা বাবুল ও সুইট। সামনে মোতাহার হোসেনের সঙ্গেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে গোপন সূত্রে জানা গেছে।

৬ জন অস্ত্রধারী বডিগার্ড নিয়ে চলাচল

যেদিন থেকে রাঙ্গা কাশিমবাজারের ওই বাড়িতে অবস্থান করছেন এবং হাতীবান্ধা পাটগ্রাম এলাকায় ভোটের কাজ করছেন সেদিন থেকেই কালো পোশাক পরিহিত ছয় অস্ত্রধারী বডিগার্ড তাকে ঘিরে রাখছেন। সাধারণ ভোটারদের অভিযোগ, অস্ত্রধারী বডিগার্ড নিয়ে পাড়া-মহল্লায় ঘোরাঘুরি এর আগে কাউকে দেখেননি । এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে ভোটের মাঠে। সবার চোখে কালো চশমা, কালো পোশাক, পকেটে পিস্তল, যেন বলিউডের সিনেমা স্টাইলে ভোট চাইছে।

প্রশাসন চুপ

ভোটারদের দাবি, একজন মাফিয়া যেভাবে এলাকায় ভোট চাইছেন, তাতে প্রশাসনের বাধা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রশাসন তার বেলায় কেন চুপ করে আছেন, তা রীতিমতো অবাক করার বিষয়। অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, ‘লালমনিরহাট জেলা পুলিশ সুপারকে দুই কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে চুপ করিয়ে রেখেছেন রাঙ্গা।’ ‘হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম থানার ওসিকে মোটা অংকের টাকা ঘুষ দিয়ে চুপ করিয়ে রেখেছেন।’ যার বিরুদ্ধে এত মামলা, যিনি কি না ১৫ বছর আওয়ামী লীগের হয়ে দালালি ও মন্ত্রিপরিষদে থেকে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন, যিনি কি না জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অস্ত্রহাতে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই রাঙ্গা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আর ভোট চাইছেন। প্রশাসন কেন তাকে গ্রেফতার করছেন, না তা নিয়ে সবাই চিন্তিত।

জামায়াত ও বিএনপির প্রার্থীরা যা বলছেন

জামায়াত ও বিএনপি প্রার্থীর অনুসারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোটের মাঠে মসিউর রহমান রাঙ্গা কোনো ফ্যাক্ট নন। জনগণ আওয়ামী লীগকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবে। আর জাতীয় পার্টি অনেক আগেই এই আসন থেকে নাই হয়ে গেছে। ফলে রাঙ্গা যা করছে, তা হয়তো দুই প্রার্থীর জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। তবে রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, এভাবেই রাঙ্গা জায়গা তৈরি করে নেন।

এদিকে ২০০১ সালের পর যত নির্বাচন হয়েছে সবগুলোতেই এই আসনে আওয়ামী লীগের মোতাহার হোসেন বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। বিপরীতে প্রতিবারই দ্বিতীয় অবস্থানে জামায়াত ছিল। বিএনপি এখানে তৃতীয় বা চতুর্থ স্থানে ছিল। এবার রাঙ্গাকে ঠৈকাতে না পারলে বিএনপির জন্য বড় ভরাডুবি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ সব বিষয়ে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা বলছেন, তারা এক হয়ে ভোটের মাঠে নেমেছেন। লাঙ্গল ও নৌকার ভোট এক বাক্সে আনার জন্য কাজ করছেন। রাঙ্গাকে ঠেকানোর জন্য অবিলম্বে প্রশাসনের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াতের ঊর্ধ্বতন নেতারা জরুরি বৈঠকে বসবেন বলেও শোনা যাচ্ছে। সাধারণ ভোটারদের দাবি, অবিলম্বে এই মাফিয়া চক্রকে ঠেকাতে না পারলে জামায়াত-বিএনপির দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ভণ্ডুল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অপরদিকে টাকা লেনদেনের বিষয়ে এসপি ও ওসিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে তারা কথা বলতে রাজি হননি। তবে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, রাঙ্গা প্রশাসনের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বসতে পারেননি। ফলে এক প্রকার গ্রেফতারের ভয়ভীতি নিয়েই হয়তো কাজ করে বেড়াচ্ছেন। পুলিশ মামলাগুলো নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। রাঙ্গার বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর