ঢাকা: জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, আমাদের অ্যাসেসমেন্ট হলো সারাদেশের নারী ভোটাররা জামায়াতকে বেশি ভোট দেবেন। কারণ মহিলারা শান্তিপ্রিয় এবং তারা বিশৃঙ্খলা ও উগ্রতাকে পছন্দ করেন না।
তিনি বলেন, সারাদেশে আমাদের নারীরা খুব অ্যাকটিভ। আমাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বুঝতে পেরেছে যে, জামায়াতের মহিলারা যে পরিমাণ অ্যাকটিভ, তাতে মহিলাদের সিংহভাগ ভোট জামায়াত পাবে। এ জন্যই তারা সারাদেশে আমাদের মহিলাদের ওপর আক্রমণ করছে, হেনস্তা করার চেষ্টা করছে, ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
সারাদেশে জামায়াতসহ ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের নারীকর্মীদের নির্বাচনি কাজে বাধা প্রদান, সহিংস হামলা এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এমন একটি দল, যাদের ৪৩ শতাংশ মহিলা এবং এর সংখ্যা কম নয়, আলহামদুলিল্লাহ। আরপিওতে ৩৩ শতাংশ মহিলা থাকার বিধান আছে রাজনৈতিক দলগুলোর। একমাত্র জামায়াতই এই শর্তটি পূরণ করতে পেরেছে। নির্বাচন খুব নিকটে এবং এ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর মহিলারা খুবই অ্যাকটিভ। আমাদের মহিলারা স্ব স্ব এলাকায় বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। তারা যেমন ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, তেমনিভাবে পুরুষ কর্মী-সমর্থকরাও ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা সবসময় এটা মনে করি, নারীরা আমাদের অত্যন্ত সম্মানীয় জাত। আমাদের মায়ের জাত, আমাদের বোনের জাত, আমাদের মেয়ের জাত এবং তাদের সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলেরই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে যারা বেশি বেশি চিৎকার করে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতার কথা বলে, তারা এখন দেখছি শুধু রাজনৈতিক কারণে নারীদের ওপর হামলা করছে এবং এটা শুধু নারীদের ওপর করছে না; সারাদেশে নারী-পুরুষ সবার ওপরই হামলা শুরু হয়েছে। প্রতিপক্ষের জিহ্বা কেটে দেওয়ার কথা বলছে, জামায়াতকে ভোট দিলে হাত নিয়ে যেতে পারবে না-এমন কথা বলছে।
নির্বাচনি সহিংসতার কিছু খণ্ডচিত্র তুলে ধরে ডা. তাহের বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করছি, দেশের বিভিন্ন জেলায় নির্বাচন কর্মকাণ্ডে যুক্ত নারীরা, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর নারীকর্মীরা ধারাবাহিকভাবে হামলা, মারধর, অপমান, ভয়ভীতি ও সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। এটি নারীর নিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট একটি গভীর জাতীয় উদ্বেগের বিষয়।
তিনি বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আজ যাদের ওপর হামলা হচ্ছে তারা এক দলের নারী; আগামীকাল তারা অন্য যেকোনো দলের হতে পারে, হতে পারে আমাদেরই মেয়ে, বোন বা ছাত্রী। এই সহিংসতা থামানো না গেলে রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সব নারীকে সরিয়ে দেওয়ার একটি ভয়ংকর প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা কারোরই কাম্য নয়। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রোববার (২৫ জানুয়ারি) দুপুরে যশোর-২ আসনে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোটের প্রচারের সময় জামায়াতের নারী নেত্রীদের ওপর যুবদলের হামলা ও হেনস্তার ঘটনা ঘটে। এতে ২ জন নারী আহত হন।
‘চুয়াডাঙ্গায় ২৫ জানুয়ারি রোববার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেলের পক্ষে জামায়াতে ইসলামী ও তার অঙ্গসংগঠনের নারী নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছিলেন। এ সময় এলাকার বিএনপির কয়েকজন নারী কর্মী প্রথমে তাদের বাধা দেন এবং হেনস্তা করেন। পরে বিএনপির পুরুষ কর্মীরাও ঘটনাস্থলে এসে জামায়াতের নারী কর্মীদের গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই ঘটনায় জামায়াতের ৫ জন নারী আহত হন।’
তিনি বলেন, ‘কুমিল্লায় নির্বাচনি প্রচারের সময় জামায়াতের নারী কর্মীদের প্রকাশ্যে ঘিরে ধরে হেনস্তা করা হয়। নারীদের হিজাব-নিকাব খুলে নেওয়া হয়। টাঙ্গাইলের গোপালপুরে বিএনপি কর্মীদের দ্বারা জামায়াতের নারীকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। লালমনিরহাটে জামায়াতের নারী কর্মীদের হিজাব নিয়ে টানাহেঁচড়া করে এবং হিজাব খুলে নেয় বিএনপি কর্মীরা। ৪টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়, ১টি ল্যাপটপ ভাঙচুর করা হয়।‘
‘ভোলায় লালমোহনের রামগঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে জামায়াতের নারী কর্মীরা গণভোট ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নিতে ইউনুছ পাটওয়ারীর বাড়িতে যান। এ সময় স্থানীয় নুরনবীর ছেলে রুবেল (২৮) তাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘অপরদিকে ভোলার চরফ্যাশনে পছন্দের প্রার্থীর বিপক্ষে নির্বাচনি প্রচারে নামায় হাজেরা বেগম নামে এক নারীকে মারধর করে গুরুতর আহত করেন স্থানীয় এক যুবদল নেতা শাহাবুদ্দিন। এ সময় তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে ওই নারীর ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকেও নির্মমভাবে মারধর ও পেটে লাথি মারা হয়।’
জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, জামায়াত নারীরা যাতে নির্বাচনি কাজ না করতে পারে, সে জন্য হুমকি দিয়েছেন বিএনপি নেত্রী ও বিএনপি এমপি প্রার্থীর স্ত্রী এবং বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া। পাপিয়া তার বক্তব্যে বলেন, ‘মা-বোনদের উদ্দেশে বলছি, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামের ছাত্রীসংস্থার কর্মীরা কেউ বাসায় গেলে ৯৯৯-এ কল দিয়ে ধরিয়ে দেবেন, যাতে বয়ান দেওয়ার আর সুযোগ না পান।’
ডা. তাহের আরও বলেন, মেহেরপুরের গহরপুর গ্রামে জামায়াতের নারী কর্মীদের হেনস্তার প্রতিবাদ করায় তিনজনকে মারধর করা হয়। ভোট চাইতে গেলে স্থানীয় বিএনপি নেতা আলেহিম ও হায়দারের নেতৃত্বে এই হামলা ও মারধর করা হয়। ঢাকার কেরানীগঞ্জে বিএনপি কর্মীদের হাতে জামায়াতের নারীকর্মীরা মারধরের শিকার হন।
তিনি বলেন, উল্লেখিত ঘটনা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সংঘর্ষে নারী কর্মীরা আহত হয়েছেন, বাধার মুখে পড়েছেন, কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেননি। এই পরিস্থিতি শুধু নারীদের জন্য নয়, এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি ভয়াবহ সংকেত। কারণ যেখানে নারীরা নিরাপদ নয়, সেখানে গণতন্ত্র টিকে না।
সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, নারীদের ওপর সংঘটিত সব হামলার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। দোষীদের দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। নির্বাচনি কর্মসূচিতে নারীদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও উসকানিমূলক প্রচারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে নারীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজকে দলনিরপেক্ষভাবে নারীর পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
‘নারীর ওপর হামলা মানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ওপর হামলা। এই সহিংসতা বন্ধ না হলে এই রাষ্ট্রের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সভ্যতা সবই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে এবং নারীরা ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কখনোই এই অন্যায়ের সঙ্গে আপস করবে না।’
তিনি বলেন, ‘এখানে আমরা কয়েকটি মাত্র ঘটনার কথা বিবৃত করলাম। সারাদেশে এ রকম অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় নারীদের ইস্যুটিকেই অগ্রাধিকার দিয়ে এখানে পেশ করেছি।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম এবং সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
নারীদের ওপর এসব হামলার প্রতিবাদে আগামী ৩১ জানুয়ারি ঢাকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে জামায়াতের নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হবে বলে জানান ডা. তাহের। এ সমাবেশে সারাদেশের নারীরা যোগ দেবেন বলেও তিনি জানান।