ঢাকা: নিজের ঘোষিত উন্নয়ন পরিকল্পনার মাত্র ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেও দেশের মানুষের সমর্থন অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘টাইম ম্যাগাজিন’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ আত্মবিশ্বাসের কথা বলেছেন।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) প্রকাশিত প্রায় ৩ হাজার ৩০০ শব্দের বিশেষ প্রতিবেদনে তারেক রহমানকে Bangladesh’s Prodigal Son বা ‘বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তনকারী উত্তরাধিকারি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে টাইম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কণ্ঠস্বরজনিত সমস্যা ও শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তারেক রহমান। দেশে ফেরার কয়েকদিনের মধ্যেই তার মা ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দিলেও রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে আসার প্রশ্নে তিনি অনড় রয়েছেন।
‘টাইম’র সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশের মানুষ এবং দলের কর্মী-সমর্থকেরাই তাকে রাজনীতিতে টিকিয়ে রেখেছে। তিনি বলেন, কেবল পারিবারিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং দলের আস্থা ও সমর্থনের কারণেই তিনি নেতৃত্বে রয়েছেন।
দেশে ফেরার পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকার। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তিনি এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, তার নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রতি প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ১৯ শতাংশে সীমাবদ্ধ।
তবে প্রতিবেদনে তার রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কিত দিকগুলোর কথাও তুলে ধরা হয়েছে। অতীতে বিএনপির শাসনামলে দুর্নীতির অভিযোগ এবং বহুল আলোচিত ‘বৈদ্যুতিক খাম্বা’ বিতর্ক এখনো তার ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলে উল্লেখ করেছে টাইম।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তারেক রহমান বলেন, ‘সেগুলো ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, যা অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করেছে।’ তিনি বলেন, ‘অপরাধ করলে বিচার হবে, তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়।’
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিরও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টাকার অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং তরুণদের বেকারত্বকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়াকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
টাইম তারেক রহমানকে তুলনামূলকভাবে ‘টেকনোক্র্যাটিক’ রাজনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সাক্ষাৎকারে তিনি খাল খনন, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, ঢাকায় নতুন সবুজ এলাকা সৃষ্টি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বের পরিকল্পনার কথা বলেন। তার মতে, এসব পরিকল্পনার মাত্র ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা গেলেও জনগণের সমর্থন নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের রাজনৈতিক রূপান্তর, ছাত্র আন্দোলন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থান নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রম এখনো অসম্পূর্ণ এবং নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে— তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
নিজেকে তুলনামূলকভাবে নরম ও শ্রোতামুখী নেতা হিসেবে তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাই হবে তার সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ‘আজ একটি দল নিষিদ্ধ হলে ভবিষ্যতে অন্য দলও একই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।’
টাইম-এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। তবে অতীতের বিতর্ক, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা—এই তিনটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে সেই আশার স্থায়ীত্ব প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘স্পাইডার-ম্যান’র একটি সংলাপ উদ্ধৃত করে তারেক রহমান বলেন, ‘বড় ক্ষমতার সঙ্গে বড় দায়িত্বও আসে—আমি মনেপ্রাণে এটি বিশ্বাস করি।’