Monday 02 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রংপুর-৪ আসন
ভরসা পরিবারের ফিরে আসার লড়াই, পরিবর্তনের প্রত্যয়ে মাঠে এনসিপির আখতার

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৫ | আপডেট: ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৬

বিএনপির প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা, এনসিপির আখতার হোসেন ও জাপার আবু নাসের মো. শাহ মাহবুবুর রহমান। ছবি: সারাবাংলা

রংপুর: আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে নির্বাচন নিয়ে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও জাতীয়পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। যদিও গতবছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্বাচনে আসতে পারছে না আওয়ামী লীগ (সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ)। সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ জায়গায় বিএনপির শক্ত প্রতিপক্ষ হওয়ার চেষ্টা করছে জামায়াত, এনসিপি ও জাতীয় পার্টি। এই দল তিনটি তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে শক্ত অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে।

বর্তমানে সারাদেশে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ ক্ষেত্রে থেমে নেই উত্তরের জেলা রংপুরও। তিস্তা তীরের এই অঞ্চলে সাধারণ মানুষের জীবনের লয় চলে স্বপ্ন আর সংগ্রামে। ভোটের হাওয়া এবার সেই লয়ে এক নতুন ছন্দ এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের ছায়া থেকে বেরিয়ে নতুন বন্দোবস্ত ও গণতন্ত্র রক্ষার দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠছে এখানে।

বিজ্ঞাপন

জেলার হাট-বাজার, ধানখেত, দোকানগুলোতে গল্প-আড্ডায় এখন শুধুই প্রসঙ্গ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মিছিল-মিটিং, উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য প্রমাণে উঠে-পড়ে লেগেছেন তারা। তবে একসময়ের প্রচলিত বাণী ‘রংপুরের মাটি, জাতীয় পার্টির ঘাঁটি’ এবং ‘রংপুরের রাজনীতিতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদই যে শেষ কথা’- বাস্তবে এখন আর এমন নেই। আগে রংপুর জেলার সবক’টি আসনই জাতীয় পার্টির দখলে থাকতো। কিন্তু এখন পালটে গেছে সেই চিত্র।

এর আগে ভোটারবিহীন ও ভোট কারচুপি করে টানা মেয়াদে থাকা আওয়ামী লীগ দখলে নেয় জেলার চারটি আসন। আর আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী হওয়ায় দু’টি আসন ধরে রাখতে পারে জাপা। তবে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর এখন রংপুরের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ পালটে গেছে বলে মনে করছেন অনেকে। এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতে রংপুর থেকে আসন বের করা জাপার জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কারণ, এখানকার আসনগুলোতে এবার বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির শক্ত প্রার্থী রয়েছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আসনভিত্তিক পরিক্রমায় এবার সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে সারাবাংলার আয়োজনে থাকছে রংপুর-৪ (কাউনিয়া ও পীরগাছা) আসন। বর্তমানে এই এলাকা যেন এক রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে। যেখানে দীর্ঘদিনের জাতীয় পার্টির আধিপত্য ভেঙে পড়ছে, আর উঠে আসছে পরিবর্তনের অটুট প্রত্যয়। এবার রংপুর-৪ আসনের মানুষ তাদের ভোটার সত্ত্বাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

রংপুরের কাউনিয়া ও পীরগাছার ধানখেতের সবুজে মোড়া পথে, যেখানে তিস্তার তীরে জীবনের লয় চলে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম আর আকাঙ্ক্ষায়, সেখানে এখন ভোটের হাওয়া বইছে এক নতুন ছন্দে। চায়ের দোকান থেকে হাট-বাজারে, তরুণদের চোখে জ্বলে উঠছে পরিবর্তনের আশা, আর বয়স্কদের কথায় মিশে যাচ্ছে অতীতের স্মৃতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগাম ঘোষণায় রংপুর-৪ আসন যেন এক রাজনৈতিক ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিনের আধিপত্যের ছায়া মিলিয়ে যাচ্ছে, আর উঠে আসছে নতুন নেতৃত্বের প্রত্যয়।

রংপুর, উত্তর বাংলার এই প্রাচীন ভূমি, তার রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সমৃদ্ধ। এই অঞ্চল ঐতিহ্যবাহী উৎসব, স্থানীয় গান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচিত, এই ঐতিহ্যের মাটিতে রাজনীতি সবসময়ই গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, যা নির্বাচনি লড়াইকে আরও তীব্র করে তোলে। কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর-৪ আসনটি ঐতিহাসিকভাবেই রংপুরের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র।

একসময়ের জাতীয় পার্টির দুর্গখ্যাত এই আসন এখন বিভিন্ন শক্তির টানাপড়েনের ময়দান। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপি মাত্র একবার জয়ী হতে পারলেও এখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এই আসন হয়ে উঠেছে বহুপাক্ষিক প্রতিযোগিতার আঙিনা। ৫ আগস্টের পরের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির অনুপস্থিতিতে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন- এই চার শক্তির মাঝে রচিত হচ্ছে নতুন সমীকরণ।

আসনের ভোটের ইতিহাস যেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের হামিদুজ্জামান সরকারের জয় দিয়ে শুরু হয়েছে এই গল্প, যা ১৯৭৯-এ বিএনপির রহিম উদ্দিন ভরসার হাতে চলে যায়— এটিই ছিল বিএনপির একমাত্র জয় এই আসনে। তারপর থেকে আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির মধ্যে চলেছে এক অটুট আধিপত্যের খেলা। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের আব্দুর রাজ্জাক, ১৯৮৮ এবং ১৯৯১ সালে জাতীয় পার্টির শাহ আলম, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে করিম উদ্দিন ভরসা এবং ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের টিপু মুনশির একচেটিয়া শাসন ছিল।

২০১৮ সালে বিএনপির এমদাদুল হক ভরসা ১ লাখেরও বেশি ভোট পেয়ে জনপ্রিয়তা দেখালেও, বিতর্কিত নির্বাচনে টিপু মুনশি জয়ী হন। জাতীয় পার্টির অবস্থান এখন অনেকটা অনিশ্চিত। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তাদের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া এবং ২০২৪ সালে মাত্র ৪১ হাজার ভোট পাওয়া প্রমাণ করে যে, এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রভাব অনেকটাই কমে গেছে।

আসনে দলগুলোর প্রভাব এখন পরিবর্তনের মোড়ে। আওয়ামী লীগ শূন্যতায় ও শক্তিহীন জাতীয় পার্টির বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলনের উত্থান ঘটছে। জাতীয় পার্টির দুর্গখ্যাত এই আসনে যখন তাদের জনপ্রিয়তা কমেছে, তখন বিএনপি হারানো আসন পুনরুদ্ধারের আশায়। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের ইসলামপন্থী ভোটার বেশ শক্তিশালী, আর এনসিপি তরুণদের আকর্ষণ করছে। বাম দলগুলোর তৎপরতা এখনো শুরু হয়নি, কিন্তু সামগ্রিকভাবে লড়াই তীব্র হয়ে উঠেছে।

এদিকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বক্তব্যে ফুটে উঠছে আশা ও প্রত্যয়। এই আসনটি একসময় ‘ভরসা’ শিল্পগোষ্ঠী পরিবারের সদস্যরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন রহিম উদ্দিন ভরসা। এবারও বংশ পরম্পরায় তার ছেলে এমদাদুল হক ভরসা এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি রংপুর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, বর্তমানে কাউনিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ আসনে এনপির নেতাকর্মীরা তার পক্ষেই নির্বাচনের প্রচার চালাচ্ছেন। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমি দলের মনোনয়ন পেয়েছি। আমার দুই উপজেলার বিএনপিসহ সব অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগায়োগ করেছি; তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। আমার আসনে সব বিএনপির নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে দলের স্বার্থে কাজ করছে। এখানে কারও সঙ্গে আমার দ্বিমত নেই। আমরা সবাই জিয়ার সৈনিক।’

এই আসনে জামায়াতের বেশ শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর রংপুর মহানগর আমির এটিএম আজম খান। তবে জামায়াতের নেতৃত্বে ১০ দলীয় জোট হওয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে সমর্থন দিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। আখতার হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘চব্বিশের জুলাইয়ের আন্দোলন ফ্যাসিবাদ তাড়িয়েছে। রংপুর বরাবর উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। আগামী নির্বাচনে মানুষ এনসিপিকে ভোট দিয়ে জয়ী করবে।’

পীরগাছা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান জাতীয় পার্টি থেকে লড়ছেন। মাহবুবার রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি। কোথাও কোনো বাধা পাচ্ছি না।’

এ ছাড়া, ইসলামী আন্দোলনের জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মাদ জাহিদ হাসান এই আসনের মনোনীয় প্রার্থী। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা চায় ইসলামি দলগুলো এক হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করুক। ভোটারদের ভালো সাড়া পাচ্ছি।’

এদিকে প্রার্থীরা ভোটারদের নজর কাড়তে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিলেও সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়ায় মিশে আছে অনিশ্চয়তা ও আশা। কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ পৌর এলাকার ভোটার সুমন ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই এলাকায় ভরসা পরিবারের অবদান যথেষ্ট। বিএনপির জন্য ভালো সুযোগ এসেছে।’ পীরগাছার অন্নদানগর ইউনিয়নের ভোটার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তোহিদুল ইসলাম সারাবাংলাকে জানান, তারা তরুণ নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরীর মতে, রংপুর-৪ আসনের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবার, ইসলামী দল এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তি- সবাই তাদের অবস্থান নিয়ে এগোতে চায়। ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই আসনের ভবিষ্যৎ। এই আসনে যে দলই জয়ী হোক না কেন, স্থানীয় উন্নয়ন ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই হওয়া উচিত তাদের প্রধান লক্ষ্য। নতুন ভোটারদের মনোভাব এবং ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ভোট বিভাজনই এই আসনের ফলাফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।
সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘এবার এই আসনে ভোট বেড়েছে ৩১ হাজারেও বেশি, যার অধিকাংশই তরুণ। এদের একটা বড় অংশ তরুণ নেতৃত্বের দিকে হয়তো ঝুঁকতে পারে। তবে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকেও একেবারে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মোট ভোটার ছিল ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৩৮৩ জন। এর মধ্যে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ছিলেন ৫ জন। কেন্দ্র ছিল ১৬৩টি। এবার ভোটার বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৬ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৫৯ হাজার ১১৩ জন, পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজার ৭৮৮ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৫ জন। এই আসনে মোট ভোটার বেড়েছে ৩১ হাজার ৫২৩ জন। তবে কেন্দ্র সংখ্যা রয়েছে অপরিবর্তিত।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর