চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম-৯ সংসদীয় আসন। শহরের মূল পয়েন্টকে ঘিরে এ আসনের অবস্থান হওয়ায় যে কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত। এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়াকে বিশেষ মর্যাদার বিবেচনা করা হয়, যার কারণে মূল রাজনৈতিক দলগুলোর মরিয়া চেষ্টা থাকে নিজেদের প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার। প্রার্থীও মরিয়া হয়ে মাঠে নামেন, অতীত নির্বাচনগুলোর ইতিহাস তাই বলে।
এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। জয়ের জন্য দিনরাত মাঠ-ঘাট, অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন মূল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। অন্যান্য আসনের মতো চট্টগ্রামের এ আসনটিতেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভোটারের বিবেচনায় আছেন বিএনপি মনোনীত আবু সুফিয়ান এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ডা. একেএম ফজলুল হক। মূল লড়াইয়ের আগে ভোটারের সমর্থন আদায়ের লড়াইয়ে উভয় প্রার্থীই যেন সমানে-সমান! গণসংযোগ, প্রচার-প্রচারণায় কেউ যেন পিছিয়ে না পড়েন, উভয়ের প্রাণান্ত চেষ্টা নজরে পড়ছে যে কারও।
নগরীর কোতোয়ালী, চকবাজার এবং বাকলিয়ার মোট ১৪টি ওয়ার্ড নিয়ে চট্টগ্রাম-৯ আসনের অবস্থান। এর মধ্যে শিক্ষিত-সচেতন নাগরিকদের আধিক্য আছে কোতোয়ালী-চকবাজার অংশে আর বাকলিয়ায় আছেন শ্রমজীবী ও ভাসমান মানুষের আধিক্য। আবার আসনটিতে সংখ্যালঘু আছেন মোট ভোটারের অন্তত ৩৫ শতাংশ। প্রায় সমসংখ্যক শ্রমজীবী-ভাসমান মানুষ আছে বাকলিয়ায়।
এ আসনে মোট ভোটার সোয়া ৪ লাখের মতো। এর মধ্যে দেড় লাখেরও বেশি সংখ্যালঘু ভোটার বলে ধরা হয়। বাকলিয়ায় আছে সোয়া লাখের মতো ভোটার।
রাজনীতি সচেতন বাসিন্দাদের মতে, বাকলিয়া বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, তবে জামায়াতের সমর্থকের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। এবারের প্রেক্ষাপটে বাকলিয়ার ভোট দুই ভাগে ভাগ হবে। সেক্ষেত্রে ভোটে জয়-পরাজয়ের ফ্যাক্টর হবে সংখ্যালঘুরা। এ বাস্তবতা মাথায় রেখে ধানের শীষ এবং দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী দুজনই সংখ্যালঘুদের কাছে টানার চেষ্টায় যেমন আছেন, তেমনি চষে বেড়াচ্ছেন বাকলিয়ায়ও।

জনসংযোগে বিএনপি মনোনীত আবু সুফিয়ান
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় আছেন মোট ১০ জন। এদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী ছাড়া প্রচারে ঘাম ঝরাচ্ছেন কাঁচি মার্কায় বাসদের (মার্কসবাদী) প্রার্থী শফি উদ্দিন কবির আবিদ ও চেয়ার প্রতীকে ইসলামিক ফ্রন্টের মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ। গণসংযোগ, মিছিল-পথসভার মধ্য দিয়ে এই দুই প্রার্থীও ভোটারদের আলোচনায় এসেছেন।
প্রার্থীদের মধ্যে আরও আছেন- নাগরিক ঐক্যের নুরুল আবছার মজুমদার, গণসংহতি আন্দোলনের সৈয়দ হাসান মারুফ, জনতার দলের হায়দার আলী চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুস শুক্কুর, জেএসডি’র আবদুল মোমেন চৌধুরী এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোহাম্মদ নঈম উদ্দীন।
বিএনপির প্রার্থী আবু সুফিয়ান একেবারে ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেতা। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সামনের কাতারে আছেন। দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক পদেও ছিলেন। তিনি মূলত নগরীর চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা, যেটি চট্টগ্রাম-৮ আসনের মধ্যে পড়েছে। ওই আসন থেকে আওয়ামী লীগের আমলে তিনি দুই দফায় সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু বিএনপি এবার তাকে ওই আসন থেকে সরিয়ে এনে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে মনোনয়ন দিয়েছে।
আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও বিএনপির দলীয় কার্যালয় ঘিরে রাজনৈতিক কার্যক্রমে সরব সুফিয়ান অবশ্য এ আসনের ভোটারদের মধ্যেও পরিচিত মুখ। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করকে পাশে পাওয়ায় নির্বাচনের মাঠে বাড়তি জোর পাচ্ছেন সুফিয়ান।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী একেএম ফজলুল হক চিকিৎসক হিসেবে চট্টগ্রামে পরিচিত মুখ। পারিবারিকভাবেও তার ভালো পরিচিতি আছে। এলাকায় সজ্জন মানুষ হিসেবেই তাকে লোকজন চেনে। রাজনীতির মাঠে অত বেশি পরিচিত না হলেও সমাজসেবার কারণে তার আলাদা একটি ভাবমূর্তি আছে। তবে আমেরিকার নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতায় প্রথম দফায় তার মনোনয়ন বাতিল হলে তিনি কিছুটা পিছিয়ে পড়েন। পরে অবশ্য প্রার্থিতা ফেরত নিয়ে এসে মাঠে নেমে গেছেন জোরশোরে।
মাঠের ‘পোড়খাওয়া’ নেতা আবু সুফিয়ান এবং ‘ভদ্রলোক’ ফজলুল হককে ঘিরেই আবর্তিত চট্টগ্রাম-৯ আসনের ভোটের মাঠ। প্রচারে নেমে মাঝেমধ্যে অবশ্য দুজন দুজনের দিকে খানিকটা তীর ছুড়ছেন। যেমন- ফজলুল হকের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আমলের কোনো মামলা নেই। অথচ সুফিয়ানের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা। সুফিয়ানের সমর্থকরা যখন ভোটারের কাছে সেটা তুলে ধরে সহানুভূতি চাচ্ছেন, তখন ফজলুল হক সুফিয়ানের ‘আয়ের উৎস’ জানতে চেয়ে কামান দাগেন। জবাবে সুফিয়ান তার মার্কিন নাগরিকত্ব ও নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া আয় বিবরণীতে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগ করেন।

জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ডা. একেএম ফজলুল হক।
তবে এসব কথার যুদ্ধ ছাপিয়ে উভয়ের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিই ভোটারদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। সন্ত্রাস, মাদক নির্মূল, কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানা; এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে সুফিয়ানের প্রচার। তবে গণসংযোগে যেসব অলিগলিতে যাচ্ছেন, সেখানকার বাসিন্দাদের সমস্যা, অভাব-অভিযোগ শুনে সমাধানের আশ্বাসও মিলছে সুফিয়ানের কাছ থেকে। এক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা হচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের চেয়ারে আছেন বিএনপি নেতা শাহাদাত, যা নিয়ে ইতোমধ্যে এনসিপি অভিযোগ তুলেছে।
আবু সুফিয়ান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমানের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব আছে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সেটা অবশ্যই বাস্তবায়ন করবে। আরেকটা হচ্ছে, স্থানীয়ভাবে নানা সমস্যা আছে। যেমন-জলাবদ্ধতা। এটা সমাধানে জোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাকলিয়ার অনেক এলাকা অনুন্নত রয়ে গেছে। সেখানে মানুষের নানা অভিযোগ আছে। আমি সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করব। ভোটারদের কাছে আমার বার্তা হচ্ছে; আমি যদি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারি, আমি সেটাকে পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে আমানত হিসেবে গ্রহণ করব। ক্ষমতার দাপট দেখানো, মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন, সন্ত্রাস, মাদক, কিশোর গ্যাং; এসব চলতে পারবে না।’
অন্যদিকে ফজলুল হক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এলাকায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, চাঁদাবাজি প্রতিরোধকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। বাকলিয়ায় গণসংযোগে গিয়ে ঘোষণা করেছেন, তিনি নির্বাচিত হতে না পারলেও বাকলিয়ায় ২৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল করে দেবেন। ফজলুলের এই প্রতিশ্রুতি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বাকলিয়াকে একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও মানবিক জনপদ হিসেবে গড়ে তোলা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, মাদক ও কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আশ্বাসও দিচ্ছেন।
ফজলুল হক প্রতিদিনই চট্টগ্রাম-৯ আসনের বিভিন্ন অলিগলিতে একাধিক মিছিল, পথসভা করছেন। পুরো এলাকাকে শান্তিতে বসবাসের জন্য নিরাপদ হিসেবে গড়ে তোলা, তরুণদের কর্মসংস্থান, নাগরিক সেবা সহজ ও দুর্নীতি করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রচারে।
আবু সুফিয়ান না-কি একেএম ফজলুল হক, কাকে বেছে নেবেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের ভোটারেরা, না-কি কোনো চমক অপেক্ষা করছে, সেটা জানা যাবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর।