Thursday 05 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ঢাকা-১৬ আসন
নিরাপত্তা, বঞ্চনা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় জমে উঠেছে হেভিওয়েট লড়াই

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০০ | আপডেট: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:২২

ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির আমিনুল হক এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল বাতেন প্রচার ও জনসংযোগ করছেন। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: রাজধানীর মিরপুরের ব্যস্ত মোড়, পল্লবীর ঘনবসতি, রূপনগরের আবাসিক ব্লক আর কালশীর বালুমাখা বস্তি। সব মিলিয়ে ঢাকা-১৬ কোনো সাধারণ সংসদীয় আসন নয়। এটি রাজধানীর এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি, যেখানে মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, বস্তিবাসীর বেঁচে থাকার লড়াই আর ক্যাম্পবাসীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা একই ফ্রেমে ধরা পড়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই আসনটি তাই শুধু ভোটের হিসাব নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

এবার ঢাকা-১৬ আসনে মোট ১১জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে মাঠের বাস্তবতায় আলোচনার কেন্দ্রে দুইজন। ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির মো. আমিনুল হক এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল বাতেন। অন্য প্রার্থীরা থাকলেও প্রচার, জনসংযোগ ও ভোটার আগ্রহ, সব দিক থেকেই মূল লড়াইটি এই দুই হেভিওয়েটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভোটার বাস্তবতা: সংখ্যার চেয়ে বড় সংকট

নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ঢাকা-১৬ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৯৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ দুই লাখ ১ হাজারের বেশি, নারী প্রায় লাখ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আটজন। সংখ্যার দিক থেকে এটি বড় আসন হলেও, ভোটারদের জীবনের বাস্তবতা আরও বড়। এই আসনে রয়েছে অন্তত ৩৯টি বিহারি ক্যাম্প, যেখানে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গ্যাস, পানি, ড্রেনেজ, নিরাপত্তা- কোনো সমস্যারই যেন শেষ নেই।

বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা নাজমুল ইসলামের ভাষায়, “এখানে সংকট নিত্যদিনের। আগুন লাগে, মাদক চলে, গ্যাস-পানি নেই। আমরা চাই স্থায়ী আবাসন আর নাগরিক মর্যাদা।” এই বক্তব্য শুধু একজন ভোটারের নয়; এটি পুরো ক্যাম্পবাসীর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন।

নিরাপত্তা: ভোটের কেন্দ্রে সবচেয়ে বড় ইস্যু

ঢাকা-১৬ আসনে জলাবদ্ধতা, গ্যাস সংকট কিংবা পানির সমস্যা পুরোনো গল্প। এবারের নির্বাচনে এসব ছাপিয়ে সামনে এসেছে নিরাপত্তা। মাদক, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই- এসব শব্দ বারবার ফিরে আসছে ভোটারদের মুখে। পল্লবী, কালশী কিংবা বাউনিয়াবাঁধ; প্রায় সব এলাকাতেই একই অভিযোগ।

মিরপুর ১০-এর এক বাসিন্দা রুমান সিদ্দিক বলেন, “প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয়। অথচ দেখার কেউ নেই। আমরা নিরাপত্তা চাই, শান্তিতে থাকতে চাই।” এই নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিই ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে।

আমিনুল হক: পরিচিত মুখ, আবেগের রাজনীতি

বিএনপি প্রার্থী আমিনুল হক এই আসনের রাজনীতিতে নতুন নন। জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক হিসেবে তার একটি আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে। তিনি নিজেও এই এলাকায় বড় হয়েছেন। এই পরিচয়টি তিনি বারবার সামনে আনছেন। প্রচারণার শুরুতে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত থেকে শুরু করে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গণসংযোগ, সবকিছুতেই তিনি ‘নিজের মানুষ’ হওয়ার বার্তাটি দিতে চাইছেন।

জনসংযোগ ও প্রচারে ব্যস্ত ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আমিনুল হক। ছবি: সারাবাংলা

আমিনুল হকের বক্তব্যে উন্নয়নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সম্পর্ক ও আস্থা। তার ভাষায়, তিনি মানুষের কথা শুনে সমস্যা নথিভুক্ত করেছেন এবং নির্বাচিত হলে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আছে। বিহারি ক্যাম্প প্রসঙ্গে তিনি সরাসরি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার কথা তুলে ধরছেন, যা বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে এই আসনের যোগসূত্রকে স্পষ্ট করে।

একইসঙ্গে তিনি নির্বাচন ঘিরে অনিয়মের আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন এনআইডি সংগ্রহ, অর্থের লেনদেনের অভিযোগ তুলে বিষয়টি প্রশাসনকে জানানোর কথা বলছেন। এতে একদিকে যেমন তিনি সতর্কতার বার্তা দিচ্ছেন, অন্যদিকে ভোটারদের মধ্যে ‘ভোট বিপ্লব’ এর প্রত্যাশাও উসকে দিচ্ছেন।

আব্দুল বাতেন: পরিবর্তনের ভাষা, শৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতি

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল বাতেন মাঠে নেমেছেন ‘পরিবর্তন’ ও ‘শুদ্ধতা’র ভাষা নিয়ে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তার প্রচারণার মূল সুর— চাঁদাবাজি, দখলদারি ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।

তিনি সরাসরি বলছেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হলেই এসব অপরাধ কমে যাবে।

ক্যাম্পবাসীদের পুনর্বাসনের প্রশ্নে আব্দুল বাতেন অতীতের শাসকদের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরছেন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এতে একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংকে তিনি আশার বার্তা পৌঁছে দিতে চেষ্টা করছেন।

জনসংযোগ করছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল বাতেন। ছবি: সারাবাংলা

তিনি নির্বাচনকালীন পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আস্থা রাখার কথাও বলেছেন। এটি তার প্রচারণায় একটি কৌশলী ভারসাম্য তৈরি করেছে- একদিকে শঙ্কা, অন্যদিকে আশ্বাস।

ভোটার মনস্তত্ত্ব: আবেগ বনাম অনিশ্চয়তা

ঢাকা-১৬ এর ভোটাররা একরকম নন। কেউ হতাশ, কেউ ক্ষুব্ধ, কেউ আবার আশাবাদী। শাহীন শিকদারের নামে একজন ভোটার মনে করেন, “আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না।” আবার কেউ কেউ এই নির্বাচনকে ১৭-১৮ বছর পর একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবেও দেখছেন।

ঢাকা-১৬ এর লড়াই শুধু একটি আসনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না; এটি রাজধানীর প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক মনোভাবও তুলে ধরবে। নিরাপত্তা, পুনর্বাসন ও মর্যাদার প্রশ্নে যে প্রার্থী বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবেন, জয় অনেকটাই তার দিকেই ঝুঁকবে।

বিজ্ঞাপন

যশোরে কুখ্যাত সন্ত্রাসী মারুফ আটক
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:২০

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর