সিলেট: রূপে গুণে ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সিলেটের সীমান্তঘেঁষা জনপদ (জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানিগঞ্জ) নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ আসন। আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত একাধিক নির্বাচনে অংশ নিয়ে কোনোবারই পরাজিত হননি ভোটের মাঠে যুদ্ধে নামা দুই তারকা রাজনীতিবিদ বিএনপি নেতা ও সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবং জামায়াত নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন। কিন্তু আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনের মাঠে এবার এই দুই প্রার্থী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে এই আসনে এবার একজনকে পরাজয় মেনে নিতেই হবে।
এর আগে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও ভোট যুদ্ধে অপরাজিত থেকেই ভোট বর্জনের ইতিহাস রয়েছে এই দুই প্রার্থীর। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই আশঙ্কা নেই। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হতে দু’জনই যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ওই আসনে এর আগে নির্বাচন করেননি। আর জামায়াতের প্রার্থী জয়নাল আবেদীন আওয়ামী লীগের আমলে ওই দলের প্রার্থীকে হারিয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাই এবারের ভোটযুদ্ধ মূলত সিলেটের নগরপিতা ও জৈন্তাপুরের ভূমিপত্রের মধ্যে। নির্বাচনের আর কয়েক ঘণ্টা বাকি। তাই ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভোট যুদ্ধে নেমেছেন রাজনীতির মাঠের অপরাজিত দুই নায়ক।
ভোটের রাজনীতিতে বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী একটি প্রভাবশালী নাম। ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে তিনি কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের সিসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রার্থী সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেন। এরপর ২০১৮ সালে আবারও কামরান, দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী এবং জামায়াতের প্রার্থীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ফের মেয়র নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালে তৃতীয়বার মেয়র পদে লড়তে গিয়ে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে নির্বাচন বর্জন করেন তিনি।
সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় এখনো অঘোষিত ‘মেয়র’ আরিফুল হক চৌধুরী। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরিফকে নগর ছেড়ে ছুটতে হচ্ছে সীমান্তের গ্রাম-গঞ্জে। জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে সিলেট সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসন থেকে প্রথমে মনোনয়ন চেয়েছিলেন আরিফ। হাতে গড়া এই এলাকা অনেকটাই চেনা তার। দলের চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হয়েছেন সিলেট-৪ আসনে। দলের স্থানীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছিলেন।
কিন্তু মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর দলের মনোনয়ন-বঞ্চিতদের পাশে টানতে নানা চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়েছে আরিফকে। নগরে জনপ্রিয় হলেও গ্রামাঞ্চলের ভোটে জয়ী হতে তাকে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রচারে শেষ মুহূর্তে এসে ভোটের মাঠ জমিয়ে তুলেছেন আরিফ। এখন সময়ের অপেক্ষা… ম্যাজিক ম্যানখ্যাত আরিফের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কী ঘটতে যাচ্ছে।
জৈন্তাপুর উপজেলা যুবদল নেতা হুমায়ুন কবির খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আরিফুল হক চৌধুরী একজন কাজপাগল মানুষ। নগরীতে কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মানুষের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে বিএনপি থেকে আরিফুল হক চৌধুরী নির্বাচিত হলে এই এলাকার অবহেলিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনেও তিনি বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন। আমরা আশাবাদী তিনি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন।’
জামায়াত নেতা জয়নাল আবেদীন নিজ নির্বাচনী এলাকায় ভোটের মাঠের এক জনপ্রিয় নাম। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এরপর ২০১৪ সালে আবারও মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এবং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি কামাল আহমদের সঙ্গে লড়াই করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে নির্বাচন থেকে তিনি সরে দাঁড়ান।
প্রতিদ্বন্দ্বী অপর চার প্রার্থীর মধ্যে শেষ লড়াইটা বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী ও জামায়াতের জয়নাল আবেদীনের মধ্যে হচ্ছে এটা নিশ্চিত বলা যায়। আরিফুল হক চৌধুরী হেভিওয়েট প্রার্থী হলেও জৈন্তাপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনের নিজ এলাকার ভোটারদের বড় অংশ তার পক্ষে রয়েছেন। এর আগে জৈন্তাপুরের চিকনাগুলে গণসংযোগে অংশ নিয়ে জামায়াতের প্রার্থী জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘স্থানীয় ভোটাররা এবার তাদের নিজ এলাকার ভূমিপুত্র হিসেবে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীকেই নির্বাচিত করে সংসদে পাঠাবেন।’
জৈন্তাপুর বাজারের ব্যবসায়ী হোসেন আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়নাল আবেদীন আমাদের এলাকার সন্তান। তিনি দুই বারের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান। এলাকার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে আছেন দীর্ঘদিন থেকে। হাত বাড়ালেই জয়নাল উদ্দিন ভাইকে পাওয়া যায়। আমরা এলাকার সন্তান হিসেবে জয়নাল ভাইকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠাতে চাই। আমরা তাকে একজন জৈন্তাপুরী হয়ে সংসদে গিয়ে কথা বলার সুযোগ দিতে চাই।’
সিলেট-৪ আসনে এবার বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী (ধানের শীষ), জামায়াতের জয়নাল আবেদীন (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির মুজিবুর রহমান ডালিম (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা সাঈদ আহমদ (হাতপাখা) প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে ২৫ ইউনিয়নে ১৭২টি কেন্দ্রে মোট ভোটার ৫ লাখ ৮ হাজার ১১৮। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬২ হাজার ৭৪৫ ও নারী ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৭২ এবং হিজরা ভোটার ১।
প্রসঙ্গত, সিলেটের ৪ ভাগের ৩ ভাগ পর্যটন কেন্দ্র এই অঞ্চলে অবস্থিত। জাফলং, সাদাপাথর, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, পাংথুমাই, রাংপানি, লালাখালের মতো বেশির ভাগ পর্যটন কেন্দ্রের অবস্থান এই তিন উপজেলায়। প্রাকৃতিক তেল ও গ্যাসক্ষেত্র সমৃদ্ধ এই অঞ্চলের বালু ও পাথরও বড় বাণিজ্যিক উপাদান। এ ছাড়াও এই এলাকার তামাবিল ও ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে নিয়মিতই পণ্য আমদানি-রফতানি হয়।