ব্রাজিল থেকে ফিরে: ব্রাজিল, দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় ও বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ। আগে ছিল পর্তুগিজদের উপনিবেশ। তারা চলে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু ব্রাজিলিয়ানদের ভেতর রেখে গেছে তাদের ভাষা। সেখানকার মানুষেরা জাতিতে ব্রাজিলয়িান হলেও তাদের ভাষা পর্তুগিজ। এই ভাষাকে তারা মাতৃভাষা মনে করে। এবং এর বাইরে অন্যকোনো চিন্তা করে না। বাংলাদেশের মতো ৫৫টি দেশের সমান ব্রাজিলের চার দিকের তিন দিকেই আটলান্টিক মহাসাগর। এই সাগর ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশটির পর্যটন। শত শত বিচ আর সিটি গড়ে উঠেছে এই সমুদ্রপাড়েই। কিন্তু এখানে এসেই মনে পড়ে গেল সেই ‘অ্যান সেইন্ট মেরিনার’ গল্পের বিখ্যাত লাইনটি- ‘ওয়াটার ওয়াটার এভরি হোয়্যার, নর অ্যানি ড্রপ টু ড্রিংক’।
উন্নত জীবনযাত্রা, ডিজিটাল প্রশাসনিক কাঠামো আর উন্নতমানের সড়ক ব্যবস্থাপনার সেই দেশে বিশুদ্ধ পানি (ব্রাজিলিয়ান শব্দ আগুয়া) যেন সোনার হরিণ। মরুভুমির দেশগুলোতেও পানির দাম এত বেশি না। এই যেমন সৌদি আরবে এক লিটার বোতলের পানির দাম এক থেকে দুই সৌদি রিয়াল। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬০ টাকা। থাইল্যান্ডের পাতায়াতে পানির দাম ১০ বাথ, অর্থাৎ বাংলাদেশি ৪০ টাকা। আজারবাইজানের বাকুতে একলিটার পানির দাম সেখানকার মুদ্রায় এক মানাত বা তারও কম। অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় ৭৭ বা ৭০ টাকা। মরুভূমির আরেক দেশ আরব আমিরাতের শারজা বিমানবন্দরে পানির দাম দুই দিরহাম, বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬০ টাকা। কিন্তু একমাত্র দেশ ব্রাজিলে এক লিটার পানির দাম পড়ে আট ব্রাজিলিয়ান রিয়েল। কোথাও এটি ১০ রিয়েল, আবার কোথাও ১৫ রিয়েল। হাফ লিটার বোতলের পানির দাম ৪-৫ রিয়েল। বেশিরভাগ হোটেলে হাফ লিটার পানির দাম ৫ রিয়েল হলেও সুপার শপগুলোতে এর দাম ৪ রিয়েল।
ব্রাজিলিয়ান কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, বোতলের হাফ লিটার পানির দাম পাইকারিতে দেড় বা দুই রিয়েল। তবে এটি খুচরা বিক্রেতারা পাঁচ রিয়ালের মধ্যে বিক্রি করে থাকে। তার মানে হাফ লিটার পানির দাম বাংলাদেশি টাকায় পড়ে যায় ১০০ টাকা (এক ব্রাজিলিয়ান রিয়েল সমান ২৫ টাকা)। আর একলিটারের দাম পড়ে ২০০ টাকা। কোথাও এটি ২৫০ টাকাও নিয়ে থাকে। এমনকি হাইওয়ে সড়কের থ্রি স্টার হোটেলগুলোতে এর দাম ২২৫ টাকা। যেমন- বাংলাদেশি দুই সাংবাদিক এমদাদুল হক খান ও ইমরান হোসেন বেলেম শহর থেকে রিও ডি জেরিরোতে বাসে আসতে সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। তারা মহাসড়কের একটি হোটেলে এক লিটার পানি কিনেছিল। যার দাম নিয়েছিল ১৫ রিয়েল, অর্থাৎ ২২৫ টাকা।
রিও ডি জেনিরো, সান্তোস, সাওপাওলো, ক্যাম্পিনাস, বেলে হরিজন্তে ও বেলেম সিটিতে পানির দাম প্রায় একই। এসব শহরে বোতলের পানির পাশাপাশি জারেও পানি মেলে। স্থানীয়দের বেশিরভাগই জারের পানিই কিনে পান করে। জারের পানি তুলনামূলকভাবে দাম নাগালের মধ্যে মেলে। আবার ব্রাজিলিয়ানরা বাসা-বাড়িতে লাইনের পানিতে মেশিন লাগিয়ে নিয়েছে, যাতে সরাসরি ট্যাপের পানি পান করতে পারে। ফলে তাদের বোতলের পানির দিকে তেমন নজর নেই বললেই চলে। যদিও তারা পানির চেয়ে বিয়ারই বেশি খায়। কারণ, বিয়ারের দাম পানির তুলনায় কম। যেমন- ব্রাজিলিয়ান ব্রান্ড করোনার একলিটার মদের দাম ১৩ রিয়েল, আবার বিয়ারের দাম ১০ রিয়েল। সেজন্য পানির চেয়ে তারা বিয়ারকেই বেছে নেয় সাদরে।
সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা হলো- বাংলাদেশের কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট, বা অন্য যেকোনো শহরে হোটেলে উঠলেই অন্তত এক বোতল পানি পাওয়া যায়। সেটি শেষ হয়ে গেলে আবারও পানি দিয়ে যায়। বাথরুমে সাবান, শ্যাম্পু, পেস্ট, ব্রাশ, সেন্ডেল, চা বা কফির প্যাকেট সবই মেলে। এমনকি টিস্যু বক্সও দেওয়া হয়। কিন্তু ব্রাজিলিয়ান হোটেলগুলোতে সাবান ও শ্যাম্পু ছাড়া কোনো কিছুই মেলেনি। থ্রি স্টার মানের হোটেল স্লিপ ইনেও এক বোতল পানি মেলেনি। শুধু সাওপাওলোর হোটেল স্লিপ ইন নয়, কাম্পিনাসের হোটেল রামাদা, বেলেমের হোটেল আইবিএস, রিও ডি জেনিরোর হোটেল আটলান্টিকো, কোনোটিতেই পানি মেলেনি। বাইরে থেকে সবসময় পানি কিনে এনে পান করতে হয়েছে। মজার বিষয় হলো- হোটেলের আশেপাশে কোনো দোকান নেই। দূর থেকে পানি কিনে আনতে হয়।
ব্রাজিলে গিয়ে মনে হয়েছে, যে দেশটির তিন দিকেই আটলান্টিক মহাসাগর, সেখানে পানির দাম এত বেশি হওয়ার কারণ কী? এর উত্তর আসলে মেলানো কঠিন। বেসরকারি পর্যায়ে গড়ে ওঠা এসব বিশুদ্ধ পানির কারখানা সরকারের নির্দেশনা মেনেই হয়তো ব্যবসা করছে। যেহেতু সরকারি পর্যায়ে এরকম বোতলের পানি বিপণন করা হয় না। তবে ট্যুরিজম বেজড এই দেশের সরকারের কাছে পানির দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার আবেদন করা যেতেই পারে। কিন্তু আমার আবেদন কি পৌঁছুবে?