রংপুর: তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিস্তাপাড় যৌথ পরিদর্শন শুরু করেছেন পানি সম্পদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকাল সোয়া ১০টায় রংপুরের কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টে থেকে শুরু হয় যৌথ পরিদর্শন। এতে তিস্তার কড়াল গ্রাসের শিকার পরিবারের সদস্য, নদী আন্দোলনকারী, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, বিভাগীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তা অংশ নেন।
এই যৌথ পরিদর্শন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরিদর্শনের মাধ্যমে চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অর্থায়ন নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার (রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী এবং গাইবান্ধা) দুই কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণার ১৭ দিন অতিক্রান্ত হওয়ায় তিস্তা তীরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দারা হতাশায় ভুগছিলেন। বর্ষাকালে আকস্মিক বন্যা, শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির অভাব এবং নদীভাঙনের কারণে এই অঞ্চলের কৃষি, জীবিকা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শন তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার এরইমধ্যে চীনের কাছে সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছে এবং অর্থায়ন সংক্রান্ত চূড়ান্ত আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। চীনা বিশেষজ্ঞদের একটি দল পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে, এবং তাদের সম্মতি পেলেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পানি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে পরিচিত, যা ১০ বছর মেয়াদী এবং দুটি ধাপে বাস্তবায়িত হবে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে, ১২ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রথম ধাপে ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় হবে— যার মধ্যে চীন থেকে ঋণ হিসেবে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পের লক্ষ্য হলো নদী খনন, জলাধার নির্মাণ, বাঁধ মেরামত, স্যাটেলাইট টাউনশিপ এবং সবুজ করিডর গড়ে তোলা, যা বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করবে। এছাড়া, প্রকল্পটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
প্রকল্পের পটভূমিতে রয়েছে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু। উত্তরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই চুক্তি এবং মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। গত বছরের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মশাল মিছিল এবং মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালিত হয়েছে। চীনের সহায়তায় প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কারণ ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা দীর্ঘায়িত হয়েছে। চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ইতোপূর্বে তিস্তা এলাকা পরিদর্শনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
তিস্তা তীরের বাসিন্দারা আশা করছেন, এটি কেবল পানি সমস্যার সমাধানই নয়, বরং অঞ্চলটিকে একটি অর্থনৈতিক হাবে পরিণত করবে। তবে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে, যাতে প্রকল্পটি টেকসই হয়।