ঢাকা: মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনার ১৮৩ দিন পর হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল সর্বশেষ আহত শিক্ষার্থী আবিদুর রহিম (১২)। সে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা তাকে ছাড়পত্র দেন।
বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. মারুফুল ইসলাম বলেন, ‘২১ জুলাই এই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় আবিদের শরীরের ২২ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। সেদিনই তাকে বার্ন ইনস্টিটিউটে আনা হয়। জীবন মরণের সমস্যা ছিল আবিদের। তবে চিকিৎসকরা হাল ছাড়েনি। হাল ছাড়েনি আবিদ ও তার পরিবার।’
তিনি বলেন, ‘সর্বমোট ৫ দিন সে আইসিইউতে ভর্তি ছিল। এরপর ৬ দিন হাইডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) রাখা হয়েছে। এরপর বাকি দিনগুলো কেবিনে থাকার পর বুধবার তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। আজ সে হাসিমুখে বাড়ি ফিরছে।’
ডা. মারুফুল ইসলাম বলেন, ‘আবিদের মোট ৩৫ বার ছোটবড় অপারেশন হয়েছে। শরীরের ক্ষতস্থানে চামড়া প্রতিস্থাপন হয়েছে ১০ বার। তার দুই হাতের অকার্যকর টিস্যু ২৩ বার অপসারণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। সেজন্য ক্ষত জায়গায় শুকাচ্ছিল না। আবিদের মুখমণ্ডলে দগ্ধ বেশি ছিল। ৪৮ বার অক্সিজেন থেরাপি দেওয়া হয়েছে এবং ২৩ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছে।‘
ডা. মারুফুল বলেন, ‘সবকিছু মিলে বাসায় যাওয়ার উপযোগী হয়েছে। আবিদের বাবা মা যথেষ্ট ধৈর্যের সঙ্গে ছিল। তার ফিজিওথেরাপি দরকার যেটা সে হাসপাতালে এসে দিতে পারবে অথবা বাসায় গিয়েও দেওয়া যেতে পারে।’
ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আবিদুর রহিমের দগ্ধ কম হলেও আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জিং ছিল। তার সেফটিসেমিয়া হয়েছিল। যে কারণে ৬ মাস লেগেছে। আমাদের হাসপাতাল যে ৩৬ জন রোগীকে আমরা চিকিৎসা দিয়েছি, তার মধ্যে সর্বশেষ রোগী আবিদুর রহিম সুস্থ হয়ে বাসায় যাবে। এটা অবশ্যই আমাদের সবার জন্য আনন্দের বিষয়। এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা যাদের কাছে পেয়েছি, তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। পাশাপাশি নার্সদের বড় ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া ওয়ার্ডবয়, আয়াদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে।‘
পরিচালক বলেন, ‘সরকারের ডাকে সাড়া দিয়ে আন্তর্জাতিক ভাবে চিকিৎসকরা আসছিলেন। তারা যে পরামর্শটা দিয়েছেন, আমরা আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে একসঙ্গে বসে এমন কিছু ওষুধ, এমন কিছু মেডিসিন ও ড্রেসিং মেটেরিয়ালস ব্যবহার করতে পেরেছি, যা এর আগে বার্ন ইনস্টিটিউটে ব্যবহার হয়নি। ভবিষ্যতে আমাদের টার্গেট আছে সমস্ত রোগীদের জন্য এত উন্নতমানের চিকিৎসা ও মেটেরিয়ালস দিতে পারি, সেজন্য আমরা সবাই মিলে বসে সরকারের কাছে আবেদনও করেছি। এই মাইলস্টোনের রোগীদের মত সাধারণ রোগীদের জন্য এমন চিকিৎসা দিতে পারি।’
এ সময় আবিদুর রহিমের কাছে তার অনুভূতির কথা জানতে চাইলে, মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সে বলে, ‘আমি যখন হাসপাতালে এসেছি কোনো ভয় পাইনি। এরপর কান্না শুরু করে দেয়। আর কথা বলতে পারে নাই।’ তবে সে ধরা কণ্ঠে বলে যুদ্ধকে জয় করেছে।
আবিদের বাবা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দেশবাসীর কাছে ছেলে ও এই ঘটনায় হতাহতের জন্য দোয়া চান এবং সরকারের পক্ষ থেকে নিহত আহত বাচ্চাদের যে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা দিয়েছেন, সেই পরিমাণটা কম হয়েছে। সরকারের কাছে পুনর্বিবেচনা করতে অনুরোধ করেন।’
এর আগে, গত ২১ জুলাই দুপুর ১টা ১৫ মিনিটের দিকে রাজধানীর উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দোতলা ভবনে আছড়ে পড়ে বাংলাদেশ এয়ারফোর্সের একটি প্রশিক্ষণ বিমান। মুহূর্তেই দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে, আগুনে পুড়ে ও চাপা পড়ে প্রাণ হারায় স্কুলের বহু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক।