দেশে কর কাঠামোতে ভারসাম্য আনার জন্য নানাবিধ সংস্কারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি করের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০-১২ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫-২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)-এর উদ্যোগে সংস্থাটির কার্যালয়ে আয়োজিত জাতীয় করব্যবস্থা পুনর্গঠন বিষয়ক টাস্কফোর্স প্রণীত ‘ট্যাক্স পলিসি রিফর্ম এজেন্ডা: রিস্ট্রাকচারিং দি ট্যাক্স সিস্টেম’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার।
তিনি প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে জানান, কর-জিডিপির অনুপাত ধাপে ধাপে ৫০:৫০-এ উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সরাসরি কর থেকে রাজস্ব আহরণ জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোট রাজস্ব আয়ে বাণিজ্য করের অংশ বর্তমান প্রায় ২৮ শতাংশ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি পেলে এই কম হারেও বাণিজ্য কর থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে।
ড. জায়েদী সাত্তার আরও বলেন, দুর্বল করনীতি প্রশাসনকে নিয়মের পরিবর্তে বিবেচনাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। এর ফলে আকস্মিক নিরীক্ষা, ইচ্ছামতো মূল্যায়ন ও উৎসে কর কর্তনের মতো চর্চা গড়ে ওঠে, যা দীর্ঘমেয়াদে করব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছ করমুক্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, ডিজিটাল রূপান্তর, স্বয়ংক্রিয়করণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষাকে সামগ্রিক সংস্কারের মূল স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের বিদ্যমান করব্যবস্থা অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল ও অদক্ষ। করের আওতা সংকীর্ণ, কর প্রশাসন অতিমাত্রায় ম্যানুয়াল-নির্ভর এবং পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিদ্যমান। সুসংহত ও সুশৃঙ্খল করনীতির ভিত্তি ছাড়া কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে টেকসই ও বিশ্বাসযোগ্য রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দলভিত্তিক বা খণ্ড খণ্ড সংস্কারের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা যাবে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং বাণিজ্য কর- এই তিনটি প্রধান কর খাতে মোট ৫৫টি অগ্রাধিকারভিত্তিক নীতিগত বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি কর খাতে ৩২টি, ভ্যাটে ১০টি এবং বাণিজ্য কর খাতে ১৩টি নীতিগত প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরাসরি কর খাতে ব্যক্তিগত আয়করের আওতা সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। করব্যবস্থার প্রধান সীমাবদ্ধতা উচ্চ করহার নয়, বরং সংকীর্ণ করভিত্তি। কর পরিপালন উৎসাহিত করতে সর্বোচ্চ মার্জিনাল করহার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। আর করপোরেট আয়কর সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে যেসব প্রতিষ্ঠানের ইকুইটি মোট মূলধনের ৩৫ শতাংশের বেশি, তাদের জন্য অভিন্ন ১৫ শতাংশ করহার প্রযোজ্য করার।