ঢাকা: বৈশ্বিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশকে অত্যন্ত অস্থির একটি বৈশ্বিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। প্রথম ধাক্কা আসে কোভিড-১৯ মহামারি থেকে, এরপর রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক সংঘাত নতুন করে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
রোববার (৮ মার্চ) পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও অস্ট্রেলিয়ান সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের (ডিএফএটি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ম্যাক্রোইকোনমিক্স ইনসাইটস: গ্লেবাল চ্যালেঞ্জেস এন্ড এ রাইজ ইন ইক্সটার্নাল সেক্টর ভার্নারিবিলিটিস’ শীর্ষক সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকাল এসব কথা বলেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ড. আশিকুর রহমান।
তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে সরকার পরিবর্তনের ফলে নীতিগত অনিশ্চয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক খাত এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
ড. আশিকুর রহমান উল্লেখ করেন, দেশের আর্থিক ও রাজস্ব খাতের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাও এই চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব কারণে সরকারকে বৈশ্বিক ধাক্কাগুলোর কার্যকর মোকাবিলায় সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, নবনির্বাচিত সরকারের জন্য অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রাজস্ব ও আর্থিক খাতে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার এবং কৌশলগত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা, যাতে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলায় দেশ আরও প্রস্তুত থাকে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে আরও নমনীয় বিনিময় হার এবং টাকার আরও কিছুটা অবমূল্যায়ন প্রয়োজন।
তিনি জানান, বর্তমানে অনেক তৈরি পোশাক কারখানা মাত্র ৫০–৬০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে এবং বেশ কিছু কারখানা প্রতি মাসে লোকসানের মুখে পড়ছে। গত সাত মাস ধরে রপ্তানি কমছে এবং জুন পর্যন্ত এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে এলডিসি উত্তরণের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সত্তার বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তন বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা সম্ভাব্যভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ স্থগিত করার জন্য জাতিসংঘের কাছে করা অনুরোধ বর্তমানে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় যেমন উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল, তেমনি এবারও সময়সীমা এক বা দুই বছর বাড়ানো প্রয়োজন।
বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ইস্যুর মুখোমুখি—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক, জাপানের সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি।
ড. সাত্তার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাই অ্যামেরিকান আইন ২০২৫ এর আওতায় সম্ভাব্য সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করে তা দিয়ে নিটওয়্যার বা তৈরি পোশাক উৎপাদন করে, তাহলে সেই পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামোয় বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। প্রস্তাবিত শুল্ক হ্রাস কাঠামোর আওতায় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ ট্যারিফ লাইনের মধ্যে প্রায় ৫ হাজার টি শূন্য শুল্কে নামিয়ে আনা যেতে পারে, যা দেশের বাজারকে আরও উন্মুক্ত করবে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনাকালে পিআরআই-এর ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় বিনিয়োগ ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ৬–৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আমদানি ৮–১০ শতাংশ হারে বাড়ানো প্রয়োজন হবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি বর্তমান গতিতে নাও থাকতে পারে। তাই আমদানি অর্থায়নের প্রধান উৎস হবে রপ্তানির দ্রুত বৃদ্ধি। এজন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার, নিম্ন মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য সুরক্ষা হ্রাস, উন্নত লজিস্টিকস, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন জরুরি।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ প্রাথমিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কার্যকর সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সময়োপযোগী সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকায় নিয়োজিত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (রাজনৈতিক) হ্যারি থম্পসন বলেন, চলমান বৈশ্বিক সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের মতো অনেক দেশই বৈদেশিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তবে সংকট একই সঙ্গে নতুন সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে।