রংপুর: ‘এক কেজি তামাক উৎপাদনে খরচ ৭০-৮০ টাকা, বিক্রি ১৭০-২১০ টাকা’—নিশ্চিত লাভের এই হিসাবই এখন রংপুর অঞ্চলের কৃষির চিত্র পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। গত বছরের মতো এবারও আলুর দাম না পেয়ে লোকসানে ডুবে থাকা কৃষকরা এবার আলু ছেড়ে তামাক চাষে ঝুঁকছেন।
জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রংপুর বিভাগে তামাকের আবাদ বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ যা হেক্টরের হিসেবে ১৮ হাজার ৭৩৩ হেক্টর থেকে ২১ হাজার ২৯৫ হেক্টরে। অপরদিকে আলু চাষ কমেছে উদ্বেগজনক হারে যা ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৯ হেক্টর থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৮৮৫ হেক্টরে।

কোম্পানির গ্যারান্টিড ক্রয়, সুদমুক্ত ঋণ আর বিনামূল্যে বীজ-সারের প্রলোভনে কৃষকরা বলছেন, ‘আলুতে লোকসান, তামাকের টাকায় সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছি।’
কৃষি অর্থনীতি ও পরিবেশবীদ শাহরিয়ার আহমেদ সাদ বলেন, ‘এই অর্থনৈতিক ছলনা শুধু কৃষকের লাভ-লোকসানের হিসাব নয়, এটি মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে, খাদ্য উৎপাদন কমাচ্ছে এবং চাষি পরিবারের স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।’
তিনি বলেন, ‘‘স্থানীয় ও বিদেশি তামাক কোম্পানিগুলোর দরজায়-দরজায় প্রচারণা আর কৃষি বিভাগের সচেতনতা কর্মসূচির অপ্রতুলতায় এই ‘বিষাক্ত গাছের’ আগ্রাসন দিন দিন বাড়ছে।’’

তামাক বনাম আলুর লাভের হিসাব
রংপুর সদরের মমিনপুর নজিরের হাট কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর ২ একর আলু চাষ করে হিমাগারে রেখে সাড়ে ৩ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। কিন্তু এক একর তামাক বিক্রি করে দেড় লাখ টাকা লাভ! এবার এক একর আলু আর ২ একর তামাক চাষ করছি।’
একই অভিজ্ঞতা জানালেন পীরগঞ্জের ভেন্ডাবাড়ী এলাকার মোসলেম মিয়া। তিনি বলেন, ‘তামাক চাষে নিশ্চিত লাভ, রোগ-বালাই কম, কোম্পানির লোক বীজ বপন থেকে কেনা পর্যন্ত মাঠে থাকে। ১৮০-২১০ টাকা কেজি দরে কিনে নেয়। আলু-ধানে তো লস!’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুসারে, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় এবার তামাক চাষ সবচেয়ে বেশি লালমনিরহাটে। শুধুমাত্র এই জেলাতেই সরকারি হিসেবে ১৮ হাজার ২২৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে।
তামাক বিরোধী সংগঠন স্বজনের প্রধান রাজু আহমেদ জানান, প্রকৃত এলাকা সরকারি সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। তিনি বলেন, ‘কোম্পানিগুলো ঘরে ঘরে যাচ্ছে, কৃষি বিভাগের প্রচার নেই।’
পরিবেশ ও মাটির ক্ষতি
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপন বলছেন, ‘তামাক চাষের পরিবেশীয় প্রভাব গুরুতর। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে- বাংলাদেশে তামাক চাষ মাটির ক্ষয়, পানি দূষণ এবং বায়ু দূষণ ঘটায়। তামাক গাছের বিস্তৃত শিকড় প্রচুর পুষ্টি শোষণ করে, যা মাটির উর্বরতা কমায়। এছাড়া রাসায়নিক সার জলাভূমিতে প্রবেশ করে দেশীয় মাছের প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি ২০২৫ সালের গবেষণার ফলাফল উল্লেখ করে বলেন, ‘তামাক চাষ অন্য ফসলের তুলনায় ২.৫ গুণ নাইট্রোজেন, ৭ গুণ ফসফরাস এবং ৬ গুণ পটাশিয়াম শোষণ করে, যা মাটির অবক্ষয় ঘটায়। বন ধ্বংসও একটি বড় সমস্যা; তামাক শুকানোর জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার কেজি কাঠ লাগে, যা অবৈধ লগিংকে উৎসাহিত করে।’
এবিষয়ে রংপুর বিভাগীয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সফিনুর রহমান সতর্ক করে বলেন, ‘তামাক উচ্চমূল্যের ফসল হওয়ায় অতিরিক্ত রাসায়নিক সার লাগে, যা মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। এর বিস্তৃত শিকড় পুষ্টি শোষণ করে জমিকে ফসলহীন করে তোলে।’
স্বাস্থ্যের ক্ষতি
তামাক চাষ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উল্লেখ করে রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, ‘তামাক চাষের কারণে শরীরের এমন কোনো অঙ্গ নেই যা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। ফুসফুস ও হৃদপিণ্ড সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার। শিশুরাও আক্রান্ত।’

তামাক চাষ করে স্বাস্থ্যের অবস্থা এখন করুণ নগরির বিন্নাটারি এলাকার উদয় চন্দ্রের। ষাটোর্ধ এই বৃদ্ধের অভিজ্ঞতা শুধুই ফাঁদের। তিনি বলেন, ‘৩৫ বছর ধরে ফাঁদে আছি। লাভ হয়, কিন্তু পরিবার অসুস্থ হয়।’
তিনি বলেন, তার স্ত্রীর মতো অনেক নারী-শিশু তামাকের গন্ধে বমি, জ্বর ও শরীরে ব্যথায় ভোগেন।
সরকারি পদক্ষেপ
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘তামাকের বিকল্প ফসল নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। সামনের বছর চাষিদের অন্য ফসলের বীজ ও সার দেওয়া হবে।’
কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক জানান, ‘দৃঢ় সরকারি পরিকল্পনা ছাড়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’
তবে সম্প্রতি দেশের কয়েকটি এলাকায় তামাক চাষ নিষিদ্ধ করে সরকার সরিষা, ভুট্টা, শাকসবজি ও চা-এর মতো বিকল্প ফসল প্রচার করলেও রংপুরের বাস্তবতা এখনও আইনি নিয়ন্ত্রণের অভাবে কোম্পানিগুলোর প্রভাব অব্যাহত রয়েই গেছে।
তবে কৃষি অর্থনীতি ও পরিবেশবীদ শাহরিয়ার আহমেদ সাদ বলছেন, ‘লাভের এই ছলনা স্বল্পমেয়াদি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি অপরিসীম। যদি তামাক কোম্পানির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম বন্ধ না হয় এবং বিকল্প ফসলের জন্য প্রকৃত ভর্তুকি না আসে, তাহলে রংপুরের উর্বর জমি একদিন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে। তাই কৃষকদের লাভের হিসাব বদলাতে হবে—তামাকের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে খাদ্যশস্যের নিরাপদ চাষে ফিরতে হবে।’