ঢাকা: ঈদ মানেই নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা। বছরের সবচেয়ে বড় এই ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে প্রতি বছরই কর্মব্যস্ত রাজধানী ঢাকা যেন হঠাৎ করেই নিরব ও অচেনা হয়ে পড়ে। কোলাহল, যানজট আর ব্যস্ততায় ভরা শহরটি ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই ধীরে ধীরে হারাতে থাকে তার চেনা ছন্দ। কারণ এখন নেই কারো অফিস, নেই যুদ্ধ করে নির্ধারিত সময়ে অফিসে যাওয়ার তাড়া। রাজধানী ছেড়েছেন চাকরিজীবীরা, শিক্ষার্থীরা শহর ছাড়ছেন তাদের পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে গ্রামে যাচ্ছেন। কমে গেছে গণপরিবহনও। আগের দিনগুলোর তুলনায় বাস, রিকশা, ভ্যান এবং মাইক্রোবাস কম চলছে। এছাড়া সকালে মেট্রোবাসের স্ট্যান্ডগুলোতেও অনেকটাই ফাঁকা। আর যারা ঈদ উদযাপনে রাজধানীতে থেকে যান, তাদের জন্য এ শহর একটি অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয় এই ফাঁকা ঢাকা।
অন্যদিকে ঢাকাবাসীর অনেকেই এ সময়টার জন্য সারাবছর অপেক্ষা করেন। কবে ঢাকা ফাঁকা হবে, আর কবে তারা ফাঁকা ঢাকায় ঘুরে বেড়াবেন।
ফেরা শুরু আগেভাগেই
ঈদের ছুটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানী ছাড়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে উপচে পড়ে মানুষের ভিড়। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের আকাঙ্ক্ষায় লাখো মানুষ ছুটে যান গ্রামের বাড়িতে। এই যাত্রা শুধু ভ্রমণ নয় এটি আবেগ, শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য অনুভূতি। আজও রাজধানী ছেড়ে যাচ্ছে নগরবাসী।
নিরব ব্যস্ত নগরী
যতই ঈদের দিন ঘনিয়ে আসে, ততই ফাঁকা হতে থাকে ঢাকা। যে সড়কগুলোতে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়, এখন সেখানে এক অন্যরকম স্বস্তির নিঃশ্বাস। গণপরিবহন কমে যায়, দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করে, অফিস-আদালতেও পড়ে ছুটির ছোঁয়া। বহুতল ভবনের জানালায় আলো কমে যায়, ব্যস্ত এলাকাগুলোতে নেমে আসে এক ধরনের অচেনা নীরবতা।
নেই যানজট, নেই হর্নের শব্দ, নেই প্রতিদিনের ব্যস্ততা। যারা ঢাকায় থেকে যান চাকরি, দায়িত্ব বা ব্যক্তিগত কারণে তাদের কাছে এই সময়টা ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। অনেকেই পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থেকেও ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেয় বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটান।
এ বিষয়ে পথচারী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ঈদের সময় ফাঁকা হতে থাকা এই ঢাকাকে পেতে আমাদের অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়। প্রতি বছর আমি ফাঁকা ঢাকা আমি বেশ এনজয় করি। এ সময় ঢাকায় হাঁটাচলা করতে অনেক ভালো লাগে। ভিড় কম, রাস্তা ফাঁকা এক ধরনের শান্তি পাওয়া যায়। তবে দোকানপাট বন্ধ থাকায় অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায় না, এ সামান্য অসুবিধা ছাড়া আমার এই ফাঁকা ঢাকা খুব এই সময়টা খুব পছন্দের।
বাসচালক আব্দুর রহমান বলেন, এ সময় যাত্রী কমে যায়, তাই ট্রিপও কমে যায়। আয় কম হলেও অন্তত যানজটের ভোগান্তি থাকে না। গাড়ি চালাতে স্বস্তি লাগে।”
রিকশাচালক জসিম উদ্দিন জানান অনেকটা একই রকমের কথা- “ঈদের সময় ঢাকায় যাত্রী কম থাকে। যারা থাকে, তারা কাছাকাছি যাতায়াত করে। আয় কমে যায়, কিন্তু রাস্তায় জ্যাম না থাকায় কাজটা সহজ হয়।”
সেবা খাতে সীমিত কার্যক্রম
ঈদের এই ছুটির দিনগুলোতে অনেক প্রতিষ্ঠানই সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালায়। হাসপাতাল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জরুরি সেবাগুলো সচল থাকলেও অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। রেস্টুরেন্ট, শপিংমল কিংবা ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই ছুটি দেয়, ফলে শহরের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে মন্থর হয়ে পড়ে।
নিরাপত্তা ও নজরদারিরাজধানী ফাঁকা হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে জোরদার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টহল জোরদার করে, যাতে চুরি বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে। আবাসিক এলাকাগুলোতে বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগেও সতর্ক থাকেন।
অন্যান্য দিনে ট্রাফিক পুলিশকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকতে হলেও ঈদের সময় সেখানে থাকে অনেকটা স্বস্তি।
নিরাপত্তাকর্মী সাইফুল ইসলাম বলেন, “বেশিরভাগ বাসা ফাঁকা থাকে, তাই আমাদের দায়িত্ব বেড়ে যায়। সার্বক্ষণিক নজর রাখতে হয়, যাতে কোনো ধরনের চুরি বা সমস্যা না হয়।”
ডেলিভারি রাইডার শাওন “ঈদের সময় অর্ডার কমে যায়, তবে যারা অর্ডার করেন তারা দ্রুত ডেলিভারি চান। ফাঁকা রাস্তা থাকায় কাজ দ্রুত করা যায়, কিন্তু আয়ের দিক থেকে একটু চাপ থাকে।
সার্বিকভাবে, ঈদের সময় ঢাকার এই পরিবর্তিত চিত্র বিভিন্ন পেশার মানুষের জীবনে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে কেউ পান স্বস্তি, আবার কেউ পড়েন আয়ের চাপে। তবুও সবার মধ্যেই থাকে ঈদের আলাদা এক অনুভূতি।
ঈদের সময় ফাঁকা হয়ে যাওয়া ঢাকা একদিকে যেমন স্বস্তির, অন্যদিকে এটি স্মরণ করিয়ে দেয় এই শহরটি মূলত মানুষের কাজের জায়গা। উৎসবের টানে মানুষ আবার ফিরে যায় আপন শিকড়ে, পরিবার-পরিজনের কাছে। আর সেই সময়টুকুতে ঢাকা শহর যেন একটু থেমে গিয়ে নিজেকেই নতুন করে চিনে নেয়।