ঢাকা: পতিত সরকারের আমলে রাজনৈতিক মদদপুষ্ট এস আলমসহ কয়েকটি গ্রুপের লুটপাটে ব্যাংক খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংক লুটারদের ক্ষমতায় দাপটে ছেদ পড়ে। ব্যাংকগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে সরকার এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন শরিয়া ব্যাংকসহ সমগ্র খাতে আস্থা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেয়। যার ফলে শরিয়াহসহ পুরো ব্যাংক খাতে আস্থা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকসহ পূর্ণাঙ্গ ১০টি শরিয়া (ইসলামী) ব্যাংকের আমানত ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং বিনিয়াগ ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালানাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। যা পরবর্তীতে অস্থিরটা কেটে আস্থা বাড়ায় ২০২৫ সাল শেষে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক বিনিয়োগ বেড়েছে ৪১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। যা শতকরা হিসাবে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, ২০১৭ সাল থেকে ব্যাংকটি সুশাসনের মূলনীতি থেকে বিচ্যুত হতে শুরু করে। তখন সুশাসনের অভাব ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয় খাতকে। গ্রাহকের আস্থা কমায় আমানতকারীরা তাদের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেয়। এটি শেষ পর্যন্ত ব্যাংকটির চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তারা নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এতে গ্রাহকের আস্থার সংকট কাটায় আমানত প্রবৃদ্ধি ভালো লক্ষ্যে করা গেছে। আবার আমানত বাড়ায় তুলনামূলকভাবে বিনিয়োগ বাড়ছে।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বেশ কয়েকটি ব্যাংক বিভিন্ন অফিসিয়াল প্রতিবেদনে তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ করেছে। এসব ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, হয় বিদেশে পাচার করা হয়েছে, নয়তো বেআইনি কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে আমানতকারীরা এসব ব্যাংক থেকে তাদের জমানো অর্থ তুলে নেয়। তবে পরে আস্থা বাড়ায় আগের চেয়ে ভালো করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০২৪ সালে ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগে ও ঋণ ছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৯০০ কোটি টাক। যা এক বছর পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এখানে এক বছরে মোট বিনিয়োগে ও ঋণ বৃদ্ধি ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি বা ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
সূত্র জানায়, এস আলম শরিয়া ধারার কমপক্ষে ৭টি ব্যাংকে ব্যাপক লুটপাট চালান। কিন্তু ২০২৪ সালে সরকারের পতনের পর পতিত সরকারের সময় রাজনৈতিক মদদপুষ্ট এস আলমসহ কয়েকটি লুটেরা গ্রুপের ক্ষমতার দাপটে ছেদ পড়ে। এতে পুনরায় আস্থা বাড়ে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর ওপর। যার ফলে শরিয়াহসহ পুরো ব্যাংক খাতে আস্থা বাড়াতে আমানত বেড়ে যায়। এর আলমের হিসাব ফ্রিজ লুটেরাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ায় লুটপাটের শিকারসহ পুরো ব্যাংক কাতে আস্থা বাড়তে থাকে। এতে দেশের ব্যাংক খাতেগ্রাহকের আস্থা বাড়ে। যার প্রতিফলন হলো ইসলামী ধারার ব্যাংকে আমানত ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে শরিয়া ধারার ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ১৯ হাজার কোটি টাকা। যা শতকরা হিসাবে ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থপাচারের কারণে দেশের ব্যাংক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংক চরম তারল্য সংকটে পড়ে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করতে বাধ্য হয়। এতে ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। ২০২৪ সালে আগস্ট সরকারের পালা বদলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে ব্যাংক খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হলে ধীরে ধীরে ফিরতে থাকে সেই আস্থা। এর ফলে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ আবারও ব্যাংকে জমা পড়তে শুরু করেছে।
যদিও ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংক খাতে কিছু সমস্যার কারণে মানুষের আস্থায় ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। এখন সেটা উল্লেখযোগ্য হারে কেটে যাচ্ছে। শুধু ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থায় নয়, পুরো খাতেই মানুষের আস্থা ফিরছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে শরিয়াহভিত্তিক ১০টির ইসলামী ব্যাংক… ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ১৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এক বছর পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়ায় ২১ লাখ ৫০০ কোটি টাকা। এখানে এক বছরে মোট বিনিয়োগে ও ঋণ বৃদ্ধি ২ লাখ ২৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ১০টি ইসলামী ব্যাংকের শতকরা হিসাবে এক বছরে আমানতের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংকে সমস্যার কারণে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পেত। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ হওয়ার পর সেই ভয় কেটে গেছে। মানুষের আস্থা ফিরেছে, তাই আমানতও বাড়ছে। এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে।