মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ থেকে সম্ভাব্য সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবতা বলছে, সংঘাতের কঠিন অধ্যায় এখনও শেষ হয়নি, বরং সামনে আরও জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটনের ‘হঠাৎ প্রস্থান’ কৌশলগতভাবে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, সামরিক সক্ষমতা এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর বড় ধরনের আঘাত হানা হয়েছে। কিন্তু তেহরানের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যুদ্ধের সমাপ্তি নির্ধারণ করবে ইরান নিজেই, যুক্তরাষ্ট্র নয়। এই অবস্থানই ইঙ্গিত দেয়, সামরিক চাপ দিয়ে দ্রুত সমাধান আনা সম্ভব নয়।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে শক্তিশালী ইরান
ইরান যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, হামলার পরও ৪০০ কেজির বেশি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান এখনও অজানা। যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় ইরান আরও কঠোর অবস্থানে যেতে পারে। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ক্ষমতার ভারসাম্য কট্টরপন্থীদের দিকে ঝুঁকেছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে নিয়ে তারা পারমাণবিক কর্মসূচিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে।
অর্থনৈতিক অস্ত্র হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ। বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল সরবরাহ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো চুক্তি ছাড়াই সরে যায়, তাহলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ কার্যত বৈধতা পেতে পারে। এতে তেহরান শুধু কৌশলগত নয়, অর্থনৈতিকভাবেও শক্তিশালী অবস্থানে চলে যাবে। প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতি জাহাজে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল আরোপের খবর নতুন বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে।
জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ বা টোল আরোপের মতো পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অস্থির করে তুলতে পারে। তাছাড়া এটি আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি দুর্বল করবে এবং সামুদ্রিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর আস্থার সংকট
উপসাগরীয় অঞ্চলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি বহাল থাকবে। সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান সরাসরি প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে একটি নতুন নজির তৈরি করেছে।
উভয় ঘটনাই উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো চুক্তি ছাড়া যুদ্ধ থেকে দ্রুত বেরিয়ে এলে তারা ভবিষ্যতে পুনরায় হামলার ঝুঁকিতে থাকবে। এতে ইরান তাদের ওপর আরও প্রভাব বিস্তার করতে পারবে এবং তেলের রপ্তানির শর্ত নির্ধারণ করতে পারবে।
এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলবে। ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম সফরে কাতারে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা আপনাদের রক্ষা করব।’ কিন্তু দ্রুত সরে গেলে সেটি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হতে পারে।
লেবাননে আগুন জ্বলতেই থাকবে
ইসরায়েলের ভূমিকাও সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই সংঘাতে শুরু থেকেই ইসরায়েল ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল বা উৎখাত করতে চেয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলেও ইসরায়েল মনে করতে পারে তাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি। তারা লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখতে পারে। বিশেষ করে লেবাননে হিজবুল্লাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার পরিকল্পনাও ইসরায়েলের রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে অতীতে ওয়াশিংটন চাইলে ইসরায়েলকে থামাতে পারে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সময় ট্রাম্প বলেন, তিনি আকাশে থাকা যুদ্ধবিমান ফিরিয়ে আনতে ইসরায়েলকে বাধ্য করেছিলেন।
তবে, এক বছরের মধ্যে দুইবার হামলার শিকার হওয়ার পর, ইরান ভবিষ্যতে হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা চাইবে। ইরান বারবার বলেছে, লেবাননে সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটি সমন্বিত চুক্তি প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে সেই ফ্রন্টের সমাধান হবে না।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রস্থান যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান না হলে হরমুজ থেকে লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
সিএনএন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে ভাবানুবাদ।