গাইবান্ধা: গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া এম.এ.ইউ. একাডেমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রায়হান সরকারের গাফিলতিতে বিদ্যালয়ের প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীর এসএসসি পরীক্ষা অনিশ্চিতের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তবে পরীক্ষার আগেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে আশ্বস্ত প্রধান শিক্ষকের।
জানা যায়, গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া এম.এ.ইউ. একাডেমিক বিদ্যালয়ের ২১২ শিক্ষার্থী এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) থেকে সারাদেশে একসঙ্গে এই মাধ্যমিক স্কুল সাটিফিকের্ট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে প্রবেশ পত্র (অ্যাডমিট কার্ড) তুলতে গিয়ে দেখেন- কারো মা-বাবার নাম ভুল, ছেলে শিক্ষার্থীর ছবির জায়গায় মেয়ে শিক্ষার্থীর ছবি। অনেকে বিজ্ঞানে পড়াশুনা করলেও অ্যাডমিট কার্ডে মানবিক বিভাগে অনুমতি এসেছে। আবার বেশ কিছু পরিক্ষার্থীর অ্যাডমিট কার্ডও আসেনি।
পরিক্ষার্থীরা বলছেন, প্রধান শিক্ষক মো. রায়হান সরকার ফরম ফিল আপের টাকার হিসাব যেন প্রতিষ্ঠানের অন্যরা না জানে, সেজন্য তিনি বিদ্যালয়ের কোন শিক্ষক বা কম্পিউটার অপারেটরের সহযোগিতা না নিয়ে একটি দোকান থেকে কাজ করার কারনে শিক্ষার্থীদের অ্যাডমিটে নানান ভুল হয়েছে।
স্কুল সংশ্লিষ্টরা জানায়, চলতি মাসের ২১ তারিখ থেকে অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি পরীক্ষায় কঞ্চিপাড়া এম.এ.ইউ. একাডেমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ৬৮ জন, মানবিকে ১৪৫ জনসহ মোট ২১২ জন অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। কয়েকদিন আগেই ফুলছড়ি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র হাতে তুলে দেয়। কিন্তু কঞ্চিপাড়া এম.এ.ইউ. একাডেমিক বিদ্যালয়ের পরিক্ষার্থীরা অ্যাডমিট কার্ড তুলে দেখতে পান ভুলে পড়া।
মঙ্গলবার (২০ এপ্রিল) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টির পরীক্ষার্থীরা ছোঁটাছুঁটি করছেন প্রবেশ পত্র হাতে নিয়ে। কারও ভুল হয়েছে মা-বাবার নাম, আবার কারও ছবির সঙ্গে মিল নেই। এমনকি কারো কারো ধর্মের পরিবর্তন হয়েছে। আবার অনেক পরিক্ষার্থীর অ্যাডমিটও আসেনি। পরিক্ষার্থীদের এসব ভুলের কথা ছড়িয়ে পড়লে অবিভাবক ও স্থানীয়রাও আসছেন প্রতিষ্ঠানটিতে। বিদ্যালয়টির মাঠে সকল পরীক্ষারর্থীদের মুখ চোখে পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চিতার ছাপ লক্ষ্য করা গেছে।
এদিকে স্থানীয়রা জানায়, স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাহায়ন সরকার বিগত সরকারের সময়ে এক ‘প্রভাবশালী নেতা’র পরিচয় দিয়ে বহু মানুষ থেকে নানা প্রলোভনে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করেন। গণ-অভ্যুত্থানের পর ওই নেতা দেশান্তরিত হওয়ার পর রাহায়ন ওই স্কুলে অনিয়মিত হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে স্কুলে এলেও খাতায় হাজিরা দিয়ে চলে যান। তার এসব অনিয়ম নিয়ে কেউ কথা বলার সাহস পান না। অনেক শিক্ষকদের টাকা থেকে বঞ্চিত করতেই তিনি একাই একটি কম্পিউটারের দোকান কাজ করতে গিয়ে ১৫০ জন পরিক্ষার্থীর জীবনে ভয়াবহ ডেকে আনছেন।

অ্যাডমিট কার্ডের জন্য স্কুলে পরীক্ষার্থীদের ভিড়।
পরীক্ষার্থী আল আমিন ও নাজিয়া আযম বন্ধন বলেন, একদিন পর পরীক্ষা। আমরা এখনো প্রবেশ পত্র পাইনি। আমাদের নাকি ফরম ফিলাপ হয়নি। আমাদের মতো অনেকেই আছে। প্রধান স্যারকে বললাম, তিনি বললেন ধৈর্য ধরো সবার সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। এখন পড়াশুনা করব নাকি প্রবেশ পত্র নিয়ে চিন্তা করব। কোনটাই মাথায় খেলছে না।
পরিক্ষার্থী পিয়াল সরকার বলেন, আমার নবম শ্রেনীতে ভর্তি হওয়ার সময় আমার জন্ম তারিখ ভুল হয়। প্রধান শিক্ষক স্যার সংশোধনের জন্য আমার কাছে টাকা নেয়। এসএসসি পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড তুলে দেখি আমার জন্ম তারিখ সংশোধন হয় নাই। চিন্তায় আছি এমন কি হবে?
বিদ্যালয়টির সাবেক সভাপতি শামসুজোহা বলেন, আমি গত তিন মাস আগেই বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলাম। ওই সময়ে শিক্ষার্থীদের ফরম ফিলাপের কাজ হয়েছে। এই প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কাজের জন্য যখন যে টাকার ভাউচার দিয়েছে, সেখানেই স্বাক্ষর করে দিয়েছে। তিনি প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ফরম ফিল আপের অনলাইন ও কম্পিউটারের কাজ বাবদে দুই থেকে আড়াইশো টাকা নিয়েছেন। তারপরও কেনো ভুল। হবে। আমার জীবনে এমন প্রধান শিক্ষক দেখি নাই যে, নিজেই কিছু টাকা আত্নসাত করার জন্য শিক্ষার্থীদের জীবনে অনিশ্চতা ডেকে নিয়ে আসবে।
পরীক্ষার্থী হযরত আলী নামে আরেক বলেন, আমার অ্যাডমিট কার্ডে অন্য এক নারী পরিক্ষার্থীর ছবি দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার হলে এবার যে কী হবে আল্লাহ জানে। হেড স্যারকে বললাম, স্যার বলছেন পরীক্ষার আগে ঠিক করে দিলেই তো হলো। প্রতিষ্ঠানের এক অবিভাবক হয়ে আমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন স্যার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়টির এক শিক্ষক বলেন, এতোগুলো পরিক্ষার্থীর ভুল এটা স্বাভাবিক না। কেউ মনে নিবে না। আমাদের অনেক শিক্ষককেও অবিভাবকসহ অনেকেই ফোন দিচ্ছেন। হেড মাস্টার তো কোনো কাজেই আমাদের রাখে না। প্রতিষ্ঠানটি থেকে তিনি লাখ লাখ টাকা আত্নসাত করছেন। একটু হিসাব নিতে চাইলেই আমাদের বেতন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন।
এ বিষয়ে শিক্ষক মো. রায়হান সরকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে উত্তেজিত হলেও পরিক্ষার্থীদের তোপের মুখে বলেন, ‘আমার কারণে ভূল হয়েছে। আমি সমাধান করে দিব। একজন পরিক্ষার্থীও পরিক্ষা থেকে বাদ পড়বে না। সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কাউকে টেনশন করতে হবে না।’
ফুলছড়ি উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এসব বিষয় দেখা আমার কাজ না। শিক্ষা বোর্ড ও প্রধান শিক্ষক এসব দেখার বিষয়। কোন গুলো দেখা আপনার কাজ এমন প্রশ্ন করলে তিনি ফোন কেটে দেন।’
এ বিষয়ে ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এই প্রথম বিষয়টি আপনার কাছ থেকে জানলাম। ওই বিদ্যালয়ের কোন পরিক্ষার্থীই যেন পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয় , সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’