ঢাকা: কর সংস্কারের মূল চ্যালেঞ্জ জ্ঞানের অভাব নয়, বরং বাস্তবায়ন কৌশল ও রাজনৈতিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায়। সেই জন্য নতুন কর আরোপের পরিবর্তে বিদ্যমান করের কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমেই রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি কর বাড়াতে নগদ লেনদেন কমাতে হবে। এছাড়া করের আওতা বাড়াতে জোর দিতে হবে।
রোববার (২৬ এপ্রিল) রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এর কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবের বক্তব্যে এসব কথা বলেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান। পিআরআই’র চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।
তিনি করনীতি ও কর প্রশাসনের পৃথকীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, নীতিনির্ধারণ গবেষণাভিত্তিক আলাদা ইউনিটে থাকা উচিত এবং বাস্তবায়ন শক্তিশালী করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ড. জাইদি সাত্তার বলেন, একটি কার্যকর ও টেকসই করব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সরকার এগিয়ে যাচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে পিআরআই সহায়ক ভূমিকা রাখতে আগ্রহী। তিনি উল্লেখ করেন, উচ্চ আমদানি শুল্ক—কাস্টমস ডিউটি, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক—বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যের দাম আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্রয়ক্ষমতা সমতা (পিপিপি) অনুযায়ী বাংলাদেশে মূল্যস্তর ভারতের তুলনায় বেশি, যা বর্তমান কর কাঠামোর বিকৃতির ইঙ্গিত দেয়। সেজন্য রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সম্পূরক শুল্কের একটি সর্বোত্তম হার নির্ধারণ জরুরি।
বিশেষ অতিথি ফরিদউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজস্ব বোর্ডের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি এখনও অনেকাংশে ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ১১৩টি ভিন্ন ট্যারিফ হার ও ৫ শতাংশ থেকে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্ক বিদ্যমান, যা কর কাঠামোকে জটিল করে তুলেছে।
মূল প্রবন্ধে ড. বজলুল হক খন্দকার তিনটি প্রধান সমস্যা তুলে ধরেন। তা হলো–একই উৎপাদন পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট আরোপের ফলে করের ওপর কর, ক্ষতিকর পণ্যের ভিত্তিতে কর কাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা, এবং ডেটাভিত্তিক আধুনিক কর প্রশাসনের অভাব। আর দেশে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ হলেও এর কার্যকারিতা কম, যা দুর্বল বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দেয়।
ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ বলেন, কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপের উদ্দেশ্য রাজস্ব বা স্বাস্থ্য নয়, বরং অদক্ষ শিল্প সুরক্ষা। বাংলাদেশ ১৯৯১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম ভ্যাট চালু করলেও বর্তমানে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
সমকাল-এর সহযোগী সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে এবং কর-জিডিপি অনুপাত টানা তিন বছর ধরে কমছে। খাতভিত্তিক তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানাই।
বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল আলভারেজ এস্ট্রাদা বলেন, একটি সুষ্ঠু কর ব্যবস্থায় ভ্যাট রাজস্ব আহরণে, আয়কর বৈষম্য হ্রাসে, আবগারি কর বহিঃপ্রভাব নিয়ন্ত্রণে এবং বাণিজ্য কর শিল্প সুরক্ষায় ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই কাঠামো এখনও সঠিকভাবে পৃথকীকৃত নয়।