Thursday 07 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

টানা বৃষ্টি, তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সিন্ডিকেটে অস্থির নিত্যপণ্যের বাজার

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১ মে ২০২৬ ১৩:৪৫ | আপডেট: ১ মে ২০২৬ ১৪:২২

ঢাকা: টানা বৃষ্টি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটের কারণে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে সবজির দাম একযোগে বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। সবমিলে ক্রেতাদের নাভিশ্বাস বাড়ছে।

বিক্রেতারা বলছেন, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজি উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে। কৃষকেরা সময়মতো ফসল তুলতে না পারায় এবং পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে খুচরা ও পাইকারি বাজারে।

শুক্রবারে (১ মে) রাজধানীর বেশিরভাগ বাজার ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে। এইদিন সবজি কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বিক্রেতাদের মতে, অতি বৃষ্টিতে শুধু উৎপাদন নয়, পরিবহন খরচও বেড়েছে। ফলে বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদেরই বহন করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিও বাজার অস্থিরতার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। দেশের ধান থেকে চাল উৎপাদন, খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন-প্রতিটি ধাপেই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল রয়েছে। ফলে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহ খরচও বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে বেড়েছে চালের দাম। বর্তমানে মোটা চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, মাঝারি চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা এবং মিনিকেট চাল প্রায় ৮৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় বেশি। একইভাবে ডালের দাম কেজিতে ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে, আর ডিমের দাম ডজনপ্রতি বেড়ে ১৩০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তবে ক্রেতারা বলছেন, বৃষ্টি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দাম বাড়ানো হচ্ছে। তাদের মতে, সরবরাহ চেইনের বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় কিছু গোষ্ঠী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

ভোজ্যতেলের বাজারে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বর্তমানে বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারে প্রায় অনুপস্থিত, ফলে খোলা তেলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং তার দাম লিটারে ২০০ টাকার ওপরে উঠে গেছে।

খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানি বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে পরবর্তীতে দাম বাড়ানো হচ্ছে। অথচ তদারকি সংস্থাগুলোর নজরদারি মূলত খুচরা পর্যায়েই সীমাবদ্ধ, বড় সরবরাহকারীদের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

শুক্রবারে গরুর মাংস কেজিতে ৮০০ টাকা, খাসির মাংস ১২০০ টাকা এবং মুরগির দাম ১৮০ থেকে ৩৬০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। মাছের দামও গত কয়েক দিনে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবার নিয়মিত মাছ বা মাংস কেনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

যাত্রাবাড়ী আড়তের চাল ব্যবসায়ী আশরাফ আলী জানান, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়লেও কেজিতে ২-৩ টাকার বেশি বাড়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে ৫-৬ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে, যা অস্বাভাবিক। তার মতে, পাইকারি পর্যায়ের এই বাড়তি দামই খুচরা বাজারে আরও বেশি চাপ তৈরি করছে।

কাপ্তানবাজারের এক মুদি ব্যবসায়ী রহিম মিয়া বলেন, বর্তমানে তেলের বাজার পুরোপুরি কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। তারা যখন ইচ্ছা সরবরাহ কমিয়ে দেয়, আবার নিজেদের সুবিধামতো দাম বাড়ায়। অথচ তদারকি সংস্থাগুলো এসে খুচরা ব্যবসায়ীদের জরিমানা করে, মূল সমস্যার জায়গায় হাত দেয় না।

সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্যেও দেখা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে চাল, আটা, চিনি, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। অনেকেই বলছেন, প্রতি বছরই একই সময়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান দেখা যায় না। আয় স্থির থাকলেও ব্যয় বাড়তে থাকায় তারা ক্রমেই আর্থিক চাপে পড়ছেন।

তবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদেই বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হবে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির ঘটনায় আবারও প্রমাণ হয়েছে-সরকার কার্যত ব্যবসায়ীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে।

তিনি বলেন, সকালে বনস্পতি ব্যবসায়ী সমিতি দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়, আর বিকালেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সেই সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে।

নাজের হোসাইন আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কথা বললেও বর্তমানে বাজারে থাকা ভোজ্যতেলের বেশিরভাগই ৩ থেকে ৬ মাস আগে আমদানি করা। ফলে এই অজুহাতে দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই। বরং আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে সাধারণ ভোক্তারা জিম্মি হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলো কারা, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় দাম বাড়াচ্ছে-এসব সম্পর্কে অবগত থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সমস্যার লাগাম দৃশ্যমান, প্রয়োজন শুধু সেটি টেনে ধরা। কিন্তু অজানা কারণে সেই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

আবারও বাড়ল সোনার দাম
৭ মে ২০২৬ ১১:৫৪

আরো

সম্পর্কিত খবর