ঢাকা: উচ্চ বাণিজ্য ব্যয়, ধীরগতির বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং দুর্বল লজিস্টিক অবকাঠামোর কারণে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ।
তিনি বলেন, দ্রুত সংস্কার, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
শনিবার (৯ মে)ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাণিজ্য নির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় মাসরুর রিয়াজ এসব কথা বলেন।
আলোচনায় দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিকস খাত, বাণিজ্য সক্ষমতা এবং বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। আলোচনায় বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি এখন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। তবে সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থা ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
আলোচনায় তুলে ধরা হয়, বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিক পারফরম্যান্স ইনডেক্স অনুযায়ী ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ১৩৭তম। বিশ্বমান অনুযায়ী যেখানে বন্দরে পণ্য খালাসে ১ থেকে ৩ দিন সময় লাগে, সেখানে বাংলাদেশের বন্দরগুলোতে গড়ে ১১ দিন সময় লাগে। এতে ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমছে।
এছাড়া দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বর্তমানে বাংলাদেশে পণ্যবাহী ট্রাকের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ১৯ কিলোমিটার। অন্যদিকে রেলের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের হার মাত্র ৪ শতাংশ। আধুনিক কোল্ড চেইন লজিস্টিকস ব্যবস্থার অভাবেও কৃষি ও দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যের সরবরাহ ব্যয় বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমান ‘টুল পোর্ট’ মডেল থেকে দ্রুত ‘ল্যান্ডলর্ড পোর্ট’ মডেলে রূপান্তর করতে হবে। এতে বন্দর ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ব্যবহার ও পরিচালন দক্ষতা বাড়বে। একই সঙ্গে জাতীয় লজিস্টিক নীতি-২০২৪ দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
আলোচনায় বলা হয়, বন্দরে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা), ব্লকচেইন এবং পেপারলেস অটোমেশন ব্যবস্থা চালু করা গেলে পণ্য খালাসের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আধুনিক কোল্ড চেইন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর–এর সম্ভাবনার ওপর। বক্তারা বলেন, এ বন্দরের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও ট্রানজিটের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করা গেলে দেশের রফতানি আয় ১৯ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও মত দেন তারা।
আলোচনায় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বেসরকারি খাতের অবদানও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশের জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অবদান ছিল মাত্র ৮ শতাংশ, যা বর্তমানে বেড়ে প্রায় ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। গত চার দশকে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি গড়ে ১০ শতাংশের বেশি ছিল। বর্তমানে তৈরি পোশাকসহ উৎপাদিত পণ্য মোট রফতানির প্রায় ৮৫ শতাংশ দখল করে আছে।
তবে অতি নির্ভরতার ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়। বক্তারা বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ফলে রফতানি বৈচিত্র্য এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণ এখন জরুরি।
আলোচনায় জানানো হয়, বাংলাদেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বছরে প্রায় ২২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। এজন্য জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের হার বর্তমানের তুলনায় বাড়িয়ে ৩৬ শতাংশে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বাণিজ্য সহজীকরণ, দ্রুত কাস্টমস প্রক্রিয়া, প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, দক্ষ ও আধুনিক লজিস্টিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাবে পরিণত হতে পারে।