ঢাকা: ঈদের ছুটিতে যেন এক অন্যরকম রূপ ধারণ করেছে চিরচেনা ব্যস্ত নগরী ঢাকা। পরিবারের সঙ্গে কোরবানির ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গত ২৫ মে থেকেই রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন লাখো মানুষ। কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের এই বিপুল স্রোত ঢাকা ছাড়ার পর বুধবার (২৭ মে) সকাল থেকেই মেগাসিটি ঢাকা অনেকটাই জনশূন্য ও শান্ত হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সকালের মুষলধারে বৃষ্টি। সব মিলিয়ে চিরচেনা তীব্র যানজট, গাড়ির হর্নের কানফাটা আওয়াজ আর চিরস্থায়ী ব্যস্ততার বদলে এখন রাজধানীজুড়ে বিরাজ করছে এক অদ্ভুত নীরবতা ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ।
আজ সকালে মিরপুর, বনানী, মহাখালী ও বিজয় সরণিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান সড়কগুলোতে দু-একটি গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন নেই বললেই চলে। অলিগলি ও সংযোগ সড়কগুলো একদমই সুনসান। অন্যান্য দিনে যেখানে এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকতে হতো, আজ সেখানে চোখের পলকেই গন্তব্যে পৌঁছানো যাচ্ছে। বাসের চালক ও হেলপাররা জানিয়েছেন, রাস্তায় কোনো যানজট না থাকলেও যাত্রী সংকটের কারণে তারা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকছেন। এমনকি ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনেও দেখা গেছে অন্যরকম এক স্বস্তির আমেজ। আগামী ১ জুন অফিস-আদালত খোলার আগ পর্যন্ত ঢাকার এই শান্ত রূপ বজায় থাকবে।

– ছবি : সারাবাংলা
তবে এই ফাঁকা ঢাকা আর সকালের বৃষ্টি একেক নগরবাসীর জীবনে একেক রকম অনুভূতি নিয়ে এসেছে। যান্ত্রিক এই শহরের কোলাহল কমে যাওয়ায় যারা ঈদে ঢাকায় থেকে গেছেন, তাদের অনেকের মনেই বইছে আনন্দের হাওয়া। তেমনি একজন ধানমন্ডির বাসিন্দা বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা মাহমুদ ইসলাম। ফাঁকা ঢাকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে তিনি বলেন, “বছরের এই কয়েকটা দিন ঢাকাকে আসলেই নিজের শহর মনে হয়। কোনো জ্যাম নেই, হর্ন নেই, চারপাশটা কত শান্ত! আজ সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে বৃষ্টির শব্দ শুনছিলাম, সত্যি অসাধারণ এক অনুভূতি। কর্মব্যস্ত জীবনের সব ক্লান্তি যেন এই কয়েক দিনেই দূর হয়ে যায়।”
একই রকম ভালো লাগা প্রকাশ করলেন মিরপুরের বাসিন্দা শারমিন জাহান। তিনি বলেন, “অন্য সময় জ্যামের ভয়ে বাচ্চাদের নিয়ে কোথাও বের হওয়া যায় না। আজ রাস্তা এত ফাঁকা যে ওদের নিয়ে একটু ঘুরতে বের হয়েই গেলাম। ঢাকা যে এত সুন্দর হতে পারে, তা ঈদের ছুটি ছাড়া বোঝাই যায় না। তবে সকালের বৃষ্টিটা একটু বেশি ছিল, এখন আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হয়ে রোদ উঠাতে ভালো লাগছে।”

– ছবি : সারাবাংলা
কিন্তু এই ফাঁকা ঢাকা আর বৃষ্টির মেলবন্ধন সবার জন্য রোমান্টিক বা স্বস্তির ছিল না। ঈদের ঠিক আগের দিন হওয়ায় যারা শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা বা কোরবানির পশুর হাটের দিকে রওনা হয়েছিলেন, তাদের জন্য এই আবহাওয়া চরম বিরক্তি আর বিপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যারা পরিবার-পরিজনের জন্য ঈদের জামাকাপড় কিংবা শেষ মুহূর্তের মশলাপাতি কিনতে বের হয়েছিলেন, তারা পড়েছেন মহাবিপদে। রাস্তায় গণপরিবহন কম থাকায় এবং হঠাৎ নামা বৃষ্টিতে ভিজে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তামান্না জামান বললেন, “ছুটির কারণে রাস্তা ফাঁকা ঠিক আছে, কিন্তু এই সকালের বৃষ্টি সব ওলটপালট করে দিল। ঈদের শেষ মুহূর্তের কিছু কেনাকাটা বাকি ছিল, তাই বের হয়েছিলাম। কিন্তু রাস্তায় কোনো রিকশা বা সিএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। দু-একটা যা আছে, তারা দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া চাচ্ছে। বৃষ্টির জন্য ফুটপাথের দোকানগুলোও পলিথিন দিয়ে ঢাকা। ছাতা মাথায় দিয়ে কাদা-পানি মাড়িয়ে কেনাকাটা করাতা অনেক ঝামেলার।
কিন্তু ঈদ বলে কথা, তাই বৃষ্টির ঝাপটায় বিরক্ত না হয়ে এই নতুন ফাঁকা ঢাকাকে উপভোগে ব্যস্ত অনেকেই।