রংপুর: বিভাগীয় নগরীর ব্যস্ততম সড়কে লিচুর পাইকারি বাজার বসানোয় তীব্র যানজট ও দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে চলছে এই বাজার ও চাঁদাবাজি। অভিযোগ, একটি সিন্ডিকেট মৌসুমি ফল বিক্রেতাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করছে।
বিভাগীয় নগরী রংপুরের অন্যতম প্রধান সড়ক দখল করে বসানো হয়েছে লিচুর পাইকারি বাজার। রংপুর সিটি করপোরেশন কার্যালয় থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে এই বাজার গড়ে উঠলেও তা উচ্ছেদে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে নগরজুড়ে তীব্র যানজট ও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি, ফুটপাতে মৌসুমি ফল বিক্রেতাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার ও পাবলিক লাইব্রেরি হলের সামনের সড়কের প্রায় অর্ধেকজুড়ে লিচুর পাইকারি বাজার বসেছে। ব্যবসায়ীরা অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তার ওপর অবস্থান করায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
যানজটে নগরবাসীর দুর্ভোগ
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এই ওয়ানওয়ে সড়কটি সিটি বাজার ও শপিংমলসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের একটি প্রধান রুট। বিকল্প রাস্তা না থাকায় যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত তিন দিনে ওই এলাকায় অন্তত পাঁচটি ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে আহত হয়েছেন কয়েকজন।
পথচারী মমতাজ উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রধান সড়ক দখল করে বাজার বসানোয় চলাচল খুব কষ্টকর হয়ে গেছে।’ চাকরিজীবী আসমা মাসুদ বলেন, ‘রিকশায় ওই অংশ পার হতে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে।’ কলেজছাত্র মোস্তাক সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘নগরীর প্রধান সড়ক দখল করে বাজার বসানোর ঘটনা সত্যিই বিস্ময়কর। সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের সামনেই কীভাবে এটি হচ্ছে, সেটাই প্রশ্ন।’
শুধু এই সড়কই নয়, সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে জাহাজ কোম্পানি মোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার ফুটপাতও দখল করে বসানো হয়েছে বিভিন্ন অস্থায়ী দোকান। ফলে পথচারীদের চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। নগরবাসীর অভিযোগ, রংপুর ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ কেনাকাটা করতে নগরীতে আসছেন। কিন্তু যানজট ও ফুটপাত দখলের কারণে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মানবাধিকারকর্মী সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত ঈদুল ফিতরের আগেও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং এখন প্রধান সড়কই দখল হয়ে গেছে।’
ফুটপাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ
এদিকে নগরীর ব্যস্ততম সড়ক টাউন হল এলাকার ফুটপাতে মৌসুমি ফল বিক্রেতাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (১ জুন) টাউন হলের সামনের ফুটপাতজুড়ে ব্যবসায়ী পরিচয়ে একটি সিন্ডিকেট চক্র কৌশলে লিচু বিক্রেতাদের কাছ থেকে খাঁচা প্রতি ১০০ টাকা করে আদায় করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা লিচু চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
ভুক্তভোগী লিচু ব্যবসায়ীরা জানান, তারা দূর-দূরান্ত থেকে লিচু নিয়ে এসে নগরীতে বিক্রি করেন। কিন্তু টাউন হল এলাকায় বসতে গেলেই একটি প্রভাবশালী চক্র তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করছে। টাকা না দিলে বসতে দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা গ্রাম থেকে লিচু এনে বিক্রি করি। কিন্তু এখানে এসে খাঁচা প্রতি ১০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এতে করে আমাদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে, বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’ তারা আরও জানান, এই সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে লিচুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপরও।
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
এ বিষয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা দেখছি। কোনোভাবেই প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখলে রাখতে দেওয়া হবে না। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রংপুর সিটি করপোরেশন আইনগতভাবে বেআইনি স্থাপনা উচ্ছেদ এবং রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে থাকে। সিটি করপোরেশনের এই নিয়মিত দায়িত্ব সত্ত্বেও নিয়মিত লঙ্ঘন ও জনদুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।
নগর ট্রাফিক পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মারুফ আহমেদ চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা খতিয়ে দেখছি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত এই চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে নগরীর ফুটপাত বাণিজ্য আরও অস্থির হয়ে উঠবে এবং সাধারণ ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা ভোগান্তিতে পড়বেন।