ঢাকা: উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল তহবিল ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি গত এক যুগে বিভিন্ন ঋণ কেলেঙ্কারি, রাজনৈতিক প্রভাব, দফায় দফায় ঋণ পুনঃতফসিল এবং বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলাকে দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে অর্থ পাচার, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
রোববার (৭ জুন) ‘অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরাম’ (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংক খাতে সুশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেমিনারে মূল ব্ক্তব্য তুলে ধরেন ইআরএফ সদস্য ওবায়দুল্লাহ রনি ও সানাউল্লাহ সাকিব।
মূল বক্তব্যে বলা হয়, দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেলেও স্বাধীনতার পর ৭৮৬ কোটি টাকার প্রথম বাজেট থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের পর্যায়ে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। অর্থনীতির এ বিস্তারে ব্যাংক খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাতটিতে সুশাসনের ঘাটতি, ঋণ কেলেঙ্কারি ও আমানতকারীদের আস্থা সংকট বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
মূল বক্তব্যে বলা হয়, ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। বিভিন্ন ছাড় ও পুনঃতফসিলের মধ্য দিয়ে তা বেড়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়। পরে বিশেষ সুবিধার কারণে কিছুটা কমলেও চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, সুশাসন নিশ্চিত না হলে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব নয়। এজন্য পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি বাড়ানো, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
তারা বলেন, দেশের পুঁজিবাজার প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে না পারায় দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগ ও অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। ফলে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা পুরো অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।
তাদের মতে, ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক খাতের তথ্যপ্রবাহ উন্মুক্ত থাকলে আমানতকারীরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে সামাজিক চাপও তৈরি হবে।
বক্তারা বলেন, পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধার—এগুলো এখন আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাদের মতে, প্রকৃত আর্থিক চিত্র গোপন না করে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রধান শর্ত।