রংপুর: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার সর্ববৃহৎ বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। এর ঠিক আগে রংপুরের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্যের সমাধানে এই বাজেটে রংপুর অঞ্চলের জন্য বিশেষ একটি ‘থোক’ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন। পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলকে ঘুরে দাঁড় করাতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে জরুরি পদক্ষেপের কথা বলছেন তারা। বিশেষ করে, দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে এই বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ ও গবেষকরা।
বাজেট অধিবেশন শুরুর আগে এই অঞ্চলের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীরা বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে এবং শিল্পায়ন ঘরে তুলতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রংপুর মহানগর সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া রংপুর অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে সরকারকে ‘থোক’ বরাদ্দ দিতে হবে। এ অঞ্চলে কোনো শিল্পায়ন গড়ে ওঠেনি। বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় কেউ বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে না।’
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি নজরুল ইসলাম হাক্কানি বলেন, ‘পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে করার সক্ষমতা থাকলে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বরাদ্দ কেন দেওয়া যাবে না? এ বাজেটে একটি আলাদা বরাদ্দ চাই।’
রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী বলেন, ‘হাতে গোনা কয়েকটি ক্ষুদ্র শিল্প ছাড়া রংপুরে শিল্পায়ন বলতে কিছু নেই। কর্মস্থান তৈরিতে বাজেটে আলাদা বরাদ্দ দিতে হবে।’
স্বাধীনতার পর গত কয়েক দশকের উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) পর্যালোচনা করলে রংপুরের প্রতি চরম বৈষম্য স্পষ্ট হয়। বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রংপুর বিভাগ মাথাপিছু উন্নয়ন বরাদ্দ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ যেমন ৩৮-৪০ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে, সেখানে রংপুর বিভাগ পেয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ। কোনো কোনো অর্থবছরে এই বরাদ্দ ১ শতাংশের নিচেও নেমে এসেছে। ২০১৭-২০২০ সময়কালে রংপুরে মাথাপিছু উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩ হাজার টাকা, যেখানে ঢাকা বিভাগে এই পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার টাকা। রংপুরের বাসিন্দা ঢাকাবাসীর তুলনায় ছয় গুণ কম উন্নয়ন বরাদ্দ পেয়েছেন।
এদিকে দারিদ্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রংপুর শীর্ষে। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলাগুলোর তালিকায় কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও রংপুর জেলা অন্যতম। এক গবেষণায় দেখা যায়, রংপুরের ৯১.৮ শতাংশ মানুষ শিল্পায়নের তীব্র সংকটের কথা বলেছেন। প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বিনিয়োগের অভাব (৪৬.৭ শতাংশ) ও উচ্চ বেকারত্ব (৩৮.৫ শতাংশ)।
গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও স্থানীয় নাগরিকরা রংপুরের টেকসই উন্নয়নের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, অবকাঠামো ও শিক্ষা এবং কৃষি ও মজুরি সুরক্ষার প্রতি জোর দেয়ার তাগিদ দেন।
রংপুর অঞ্চলের বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা বিশ্লেষক রায়ান আহমেদ রাজু বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে কৃষি ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখবে। কারণ রংপুর বিভাগের প্রায় ২ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা তিস্তা নদীর পানি ও পলির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ নিশ্চিত ও ভাঙন রোধ সম্ভব।’
কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের উপর জোর দিয়ে এই গবেষক বলেন, ‘বেপজা ইতিমধ্যে রংপুরের সৈয়দপুরে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প নগরী গড়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। রংপুরে প্রায় ৪৫০ একর জুড়ে একটি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা প্রায় এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। বাজেটে এ বিষয়ে বাস্তবসম্মত বরাদ্দ প্রয়োজন।’
রংপুরে শিল্পায়ন না ঘটলে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে না উল্লেখ করে গবেষক রায়ান আহমেদ রাজু বলেন, ‘পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে যে চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার কথা ছিল, তার কোনো অগ্রগতি নেই।’
এদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামোয় বিশেষ বরাদ্দ জরুরি উল্লেখ করে অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরী বলেন, ‘রংপুর সিটি করপোরেশন দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনের তুলনায় সবচেয়ে কম বরাদ্দ পায়। এছাড়া এই অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পূর্ণাঙ্গ ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করাও জরুরি।’
এছাড়া এপ্রিল ও সেপ্টেম্বরের ফসলের মৌসুমের ফাঁকে এ অঞ্চলের কৃষি শ্রমিকরা খাদ্যসংকটে পড়েন। অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কৃষকদের জন্য হিমাগার ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি প্রণোদনা প্রয়োজন বলে মনে করেন গবেষকরা।
গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থনের পর রংপুর সফরে এসে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ‘বৈষম্য দূর করে রংপুরকে দেশের ‘নম্বর ওয়ান জেলা’ বানানো হবে।’ তবে সেই আশায় গুড়েবালি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কোনো একনেক সভাতেই পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলের জন্য বিশেষ কোনো প্রকল্প অনুমোদন করা হয়নি। বরং উন্নয়ন ব্যয়ের অর্ধেকই বরাদ্দ পেয়েছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা সেসময় আশ্বাস দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন। দক্ষিণে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিলেও উত্তরের জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। বর্তমান সরকারের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে এই অঞ্চলের মানুষ।’
এদিকে রংপুরের জন্য শুধু একটি বড় বাজেট নয়, প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ও সুষম বরাদ্দ। অর্থমন্ত্রী যে বাজেট পেশ করবেন, তাতে রংপুরের মানুষের এই দাবিগুলো প্রতিফলিত হয় কিনা, সেদিকে সারাদেশের নজর থাকবে।
রংপুরের আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিয়ে মতামত তুলে ধরতে গিয়ে গবেষক ও অর্থনীতিবিদরা বরাবরই সুষম বণ্টনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বেলাল উদ্দীন বলেন, ‘রংপুরের জন্য কেবল বৃহৎ আকারের বাজেট নয়, বরং সামগ্রিক বৈষম্য দূর করে প্রতিটি অঞ্চলে সুষম বণ্টন ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। স্বাধীনতার পর থেকে উন্নয়ন বৈষম্যের কারণে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হয়েছে।’