ঢাকা: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি বড় অংশ বর্তমানে চাপে রয়েছে এবং বিভিন্ন অনিয়মের কারণে কয়েকটি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে গেছে। যারা টাকা চুরি করে বিদেশে নিয়ে গেছে, তাদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না বলেও কঠোর হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
শুক্রবার (১২ জুন)রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমানত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পুরো খাতকে স্থিতিশীল করতে সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
গভর্নর জানান, ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে স্থিতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব গ্রাহক আমানতের টাকা তুলতে সমস্যায় ছিলেন, তারা ধীরে ধীরে টাকা ফেরত পেতে শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে। আবেদন গ্রহণ, বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, সাক্ষাৎকার এবং সরকারের অনুমোদনের পর নতুন এমডি নিয়োগ দেওয়া হয়।
গভর্নর আরও জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নতুন বোর্ড গঠনের কাজও সম্পন্ন হয়েছে এবং নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতোমধ্যে প্রথম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস) সমন্বয়কে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে কাজ করছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে।
ইসলামী ব্যাংকে সরকারের অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ করে মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যাংককে ঋণ দেওয়ার নির্দেশ দেয় না, এমনকি বদলি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রেও কোনো হস্তক্ষেপ করে না। তাই এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পাঁচ সদস্যের বোর্ডের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গত ১৬ মার্চ তাকে পরিবর্তন করা হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না।
ঈদের আগে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি বলেন, এটি একটি সিস্টেমিক ব্যাংক হওয়ায় বোর্ডে ন্যূনতম সদস্যসংখ্যা নিশ্চিত করতে দ্রুত নতুন নিয়োগ দিতে হয়েছে।
গভর্নর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন নীতিগত উপকরণ রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সেগুলো ব্যবহার করা হবে। তিনি আমানতকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গ্রাহকরা যেকোনো সময় তাদের টাকা তুলতে পারবেন।
তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইসলামী ব্যাংকের এডি রেশিও ছিল প্রায় ৯৩ শতাংশ, যা চলতি বছরের মার্চে ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশে পৌঁছে যায়। এ হার কমিয়ে আনতে ব্যাংকটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গভর্নরের ভাষ্য, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সামনে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হচ্ছে না। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরি তারল্য সহায়তাও দেবে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) সমস্যার সমাধান প্রক্রিয়াও শুরু হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, ১০ থেকে ১২ বছর ধরে যারা টাকা ফেরত পাননি, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের জন্যও কার্যক্রম শুরু হবে।