রংপুর: রংপুর মহানগরের কোতোয়ালী থানায় পালিয়ে বিয়ে করা এক তরুণ-তরুণীকে থানায় এনে নির্যাতন এবং ঘটনায় বাধা দেওয়ায় এক স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে পিটিয়ে জখমের ঘটনায় বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি)। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শুক্রবার (১২ জুন) রাতে উপ-পরিদর্শক (এসআই) থেকে শুরু করে কনস্টেবল পদমর্যাদার মোট ১১ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
শুক্রবার (১২ জুন) রংপুর মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানের সই করা পত্রে এই বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয়।
ঘটনার তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে পুলিশ সদস্যদের পেশাদার সৌজন্যবোধের চরম অভাব, ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও অপেশাদার আচরণের প্রমাণ পাওয়ায় ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি মেনে এই রায় ঘোষণা করেছে পুলিশ কমিশনার।
সাময়িক বরখাস্তকৃতরা হলেন—উপ-পরিদর্শক মাসুদ রানা, আলম বাদশা, আক্তারুল ইসলাম, সহকারী উপ-পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম ও মেহেরুন্নেসা এবং কনস্টেবল মুশফিকুর রহমান, মুখলেসুর রহমান, রাকিব আহমেদ, লিমা সরেন, ও ভাবনা রানি।
মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাসুদ রানা, আলম বাদশা, আক্তারুল ইসলাম প্রত্যক্ষ নির্যাতন ও দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। এছাড়া সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মনিরুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম ও মেহেরুন্নেসা থানায় কক্ষে নির্যাতনের সুযোগ তৈরি ও অপেশাদার আচরণ এবং কনস্টেবল মুশফিকুর রহমান, মুখলেসুর রহমান, রাকিব আহমেদ, লিমা সরেন, ভাবনা রানি ফুটেজে থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনে অংশগ্রহণ ও প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা করেন।
গত ৩ জুন রাতের ঘটনায় অভিযোগকারী রাকিব দাবি করেন, থানা ঘরে তাকে হাতকড়া পরিয়ে এলোপাথারি পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। তদন্ত কমিটি থানার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখেছে, ভুক্তভোগীরা কেবল শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও চরম হেনস্তার শিকার হয়েছেন।
এদিকে শাস্তি কার্যকর হলেও পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি ভুক্তভোগীদের ঘরে। অভিযোগ, ঘটনার সময় থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আজাদ রহমান ও কনস্টেবল বাসুদেব ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও নির্যাতন বন্ধ করেননি। বরং, তাদের নির্দেশেই এই নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
ক্ষতিগ্রস্ত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রাকিবের পরিবারের অভিযোগ, ‘ওসি আজাদ ও কনস্টেবল বাসুদেবের ভূমিকা তদন্তের আওতার বাইরে রেখে কয়েকজন ‘খুদে’ কর্মকর্তাকে বলি দেওয়া হচ্ছে। তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়নি, যা বিভ্রান্তিকর।’
তবে এই অভিযোগের জবাবে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, ‘কোনো সদস্যের দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে আরপিএমপি ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করে। আজ যারা বরখাস্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছি। বাকিদের নিয়েও তদন্ত চলছে, প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, গত ৩ মে রংপুরের সিও বাজার এলাকা থেকে পালিয়ে বিয়ে করা তরুণ-তরুণীকে প্রথমে থানায় নেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে থাকা ওই যুবক-যুবতীকে থানার ভেতরে মারধর করা হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব রাকিবুল ইসলাম রাকিব। তিনি নির্যাতন বন্ধ করতে গেলে পুলিশ সদস্যরা উলটো তাকে ধরে নিয়ে পিটুনি শুরু করে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে ব্যাপক চাপের মুখে প্রথমে ওসি আজাদ রহমানসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ওসি আজাদ রহমানকে খুলনা রেঞ্জে বদলি করা হয়।